প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩২ এএম
সংগৃহীত ছবিডিজিটাল যুগে ফ্রিল্যান্সিং নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ, সময়ের স্বাধীনতা এবং পরিবারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়ের সুযোগ- এই সুবিধাগুলো বহু নারীকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের পথে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে গৃহিণী, শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া নারীদের কাছে ফ্রিল্যান্সিং হয়ে উঠেছে আত্মনির্ভরতার একটি কার্যকর মাধ্যম। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পরিচয় গড়ে তোলার এই সুযোগ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। তবে এই স্বাধীনতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
ফ্রিল্যান্সার কানিজ ফাতিমা কামাল মনে করেন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঘরে বসে কাজ করি বলে অনেকেই মনে করেন, আমি আসলে কোনো সিরিয়াস কাজ করছি না। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করব- এই ধারণা থেকেই মানসিক চাপটা শুরু হয়। নির্দিষ্ট অফিস সময় না থাকায় কাজের সময়সীমা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। কাজের পরিবেশেও রয়েছে নানা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা।
কানিজ ফাতিমা কামাল আরও বলেন, অনেক সময় কাজের আলোচনা করতে গিয়ে হঠাৎ ব্যক্তিগত প্রশ্ন বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য আসে। তখন খুব অস্বস্তি লাগে। এমন পরিস্থিতিতে কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথাও মাথায় আসে। অনলাইনে কাজ করার কারণে এই ধরনের আচরণ এড়িয়ে চলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
নারী ফ্রিল্যান্সারদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কাজের নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে গিয়ে অনেক নারীই কম পারিশ্রমিকের অফার পান। কাজের শুরুতে অভিজ্ঞতার অভাব ও কাজ হারানোর ভয় থেকে অনেকেই কম দর মেনে নিতে বাধ্য হন। এতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, অন্যদিকে নিজেদের কাজের মূল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হয়।
এ বিষয়ে ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট রাইটার তমা দে বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, একই কাজের জন্য পুরুষ ফ্রিল্যান্সাররা বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। দর ঠিক করতে গেলে কিছু ক্লায়েন্ট আবার নারীদের সিরিয়াসলি নেন না। এই বৈষম্য নারীদের জন্য ফ্রিল্যান্সিংয়ের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নারী ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা। অনলাইন মিটিং বা মেসেজে অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য, ব্যক্তিগত প্রশ্ন কিংবা অস্বস্তিকর আচরণের অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। তবে এসব বিষয়ে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা বা সহায়ক পরিবেশ না থাকায় অনেক নারী চুপচাপ এসব অভিজ্ঞতা সহ্য করে যান। এতে কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নিয়মিত আপডেট থাকা ফ্রিল্যান্সিংয়ের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিনিয়ত নতুন সফটওয়্যার, টুলস ও অ্যালগরিদমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ব ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারীই নিয়মিত প্রশিক্ষণ বা স্কিল আপডেটের সুযোগ পান না।
এ বিষয়ে তমা দে বলেন, নিজেকে আপডেট না রাখলে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু সংসার, পরিবার আর কাজ- সব সামলাতে গিয়ে শেখার সময় বের করাই সবচেয়ে কঠিন।
এ ছাড়া মানসিক চাপ ও একাকিত্ব নারী ফ্রিল্যান্সারদের নীরব সমস্যা। সহকর্মীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় অনেক সময় কাজের চাপ একাই সামলাতে হয়। কাজ না পাওয়া, ক্লায়েন্ট হারানো কিংবা আয়ের অনিশ্চয়তা নারীদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। অথচ এই চাপের কথা বলার মতো জায়গা বা কাউকে জানানোর সুযোগ অনেকেরই থাকে না। তবু সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও নারী ফ্রিল্যান্সাররা থেমে নেই। নিজেদের দক্ষতা বাড়ানো, নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসের জায়গা গড়ে তুলছেন অনেকেই। কানিজ ফাতিমা কামাল মনে করেন, পরিবার ও সমাজ যদি এই কাজকে সম্মানের চোখে দেখে, তা হলে নারীরা আরও অনেক দূর যেতে পারবে।
ফ্রিল্যান্সিং নারীদের জন্য শুধু আয়ের পথ নয়, এটি নিজের পরিচয় ও সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ। তবে এই পথকে টেকসই ও নিরাপদ করতে হলে নারী ফ্রিল্যান্সারদের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ স্বাধীনতার পাশাপাশি সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই নারীর ফ্রিল্যান্সিংয়ের গল্প সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায়।
সময়ের আলো/এনএ