ভারসাম্যের পথে কর্মজীবী নারী

কন্যা জায়া জননী ডেস্ক

ক্যারিয়ার ও মাতৃত্ব- এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কর্মজীবী নারীর জীবনের অন্যতম বড় পদক্ষেপ। অফিসের নির্দিষ্ট সময়, কাজের চাপ, ডেডলাইন

2026-01-28T03:51:38+00:00
2026-01-28T03:51:38+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ভারসাম্যের পথে কর্মজীবী নারী
কন্যা জায়া জননী ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ক্যারিয়ার ও মাতৃত্ব- এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কর্মজীবী নারীর জীবনের অন্যতম বড় পদক্ষেপ। অফিসের নির্দিষ্ট সময়, কাজের চাপ, ডেডলাইন এবং পেশাগত দায়িত্বের মাঝেই একজন নারী যখন মা হন, তখন তার জীবন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। মাতৃত্বকালীন সময়টা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই সংবেদনশীল। গর্ভাবস্থার পরিবর্তন, হরমোনের ওঠানামা, ক্লান্তি ও নানা শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে অনেক নারীকে নিয়মিত অফিস করতে হয়। 

আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী এ সময় দ্বিধায় ভোগেন। ছুটি নিলে কি কর্মক্ষেত্রে তার গুরুত্ব কমে যাবে? অনুপস্থিতিতে কি তার জায়গা অন্য কেউ নিয়ে নেবে? এমন নানা প্রশ্ন তাদের মনে কাজ করে। 

দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে প্রতি দশজনের চারজন কোনো না কোনো কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সন্তান লালন-পালনের চাপ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব কিংবা পারিবারিক সচ্ছলতা থাকায় অনেক নারী অনায়াসেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

সন্তানের জন্মের পর ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হলেও অনেকের মনে হয়, এখনও সন্তানের যথাযথ যত্ন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই সময়ে সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য নিজেকে সাময়িকভাবে ছাপিয়ে দেওয়া নারী ধীরে ধীরে নিজের পেশাগত পরিচয় থেকে দূরে সরে যান। সংসার ও সন্তানের দায়িত্বে মগ্ন এই নারী সমাজের দৃশ্যমান পরিসর থেকে কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও তার ত্যাগেই গড়ে ওঠে প্রতিটি পরিবারের ভিত। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পর অর্জিত পেশাগত পরিচয় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সহজ না হলেও এই সিদ্ধান্ত অনেক সময় নারীর ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানকে এক নতুন মাত্রা দেয়। 

মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কাজে ফেরার সময়টি অনেক নারীর জন্য সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। নবজাতকের যত্ন এবং অফিসের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তৈরি হয় তীব্র মানসিক চাপ। রাতে কম ঘুম, সকালে অফিসের প্রস্তুতি, মিটিংয়ের মাঝেই শিশুর কথা মনে পড়া কিংবা বুকের দুধ খাওয়ানোর নির্দিষ্ট সময়সূচি- এসবই কর্মজীবী মায়েদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। 

এ ছাড়া, অনেক কর্মক্ষেত্র এখনও শিশুবান্ধব হয়ে ওঠেনি। ডে-কেয়ার সুবিধা, ল্যাকটেশন রুম কিংবা নমনীয় সময়সূচির অভাব মায়েদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ক্যারিয়ারে বিরতি নেন, আবার কেউ চাকরি ছেড়ে দিতেও বাধ্য হন। অথচ তিনি দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন নারী কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠান ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন। 

শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। কেউ প্রশ্ন করেন, ‘বাচ্চা রেখে অফিস করেন কীভাবে?’ আবার কেউ মন্তব্য করেন, ‘মা হয়ে এত কাজ করার দরকার কী?’ এসব প্রশ্ন ও মন্তব্য অনেক সময় নারীর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন নারী একই সঙ্গে দায়িত্বশীল মা এবং সফল পেশাজীবী হতে পারেন। 

তবে পরিবর্তনের আভাসও মিলছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং আওয়ার, ওয়ার্ক ফ্রম হোম সুবিধা এবং মাতৃত্বকালীন সহায়ক নীতি চালু করেছে। একই সঙ্গে স্বামী ও পরিবারের সহযোগিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সন্তানের দেখাশোনায় বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ মায়ের মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। 

একটি বিশেষায়িত স্কুলের প্রধান শিক্ষক সোনিয়া রহমান বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ করে কাজে ফেরা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। অফিসে বসে কাজ করছি, কিন্তু মন পড়ে থাকত বাসায় থাকা শিশুটার কাছে। তবু নিজের পরিচয় ধরে রাখার তাগিদেই আবার কাজে ফিরেছি।’ 

আইটি সেক্টরে কর্মরত মেহজাবিন ইসলাম জানান, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম সুবিধা না থাকলে হয়তো চাকরিটা ছেড়ে দিতে হতো। মা হওয়ার পর বুঝেছি, প্রতিষ্ঠান যদি একটু সহানুভূতিশীল হয়, তা হলে একজন নারী অনেক ভালোভাবে দায়িত্ব সামলাতে পারে।’ 

গণমাধ্যমকর্মী তাসলিমা আফরোজের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘রাত জেগে বাচ্চা সামলে সকালে নিউজ কাভারেজে বের হতে হয়েছে অনেক দিন। সহকর্মীদের সহযোগিতা না পেলে সম্ভব হতো না। তবু সমাজের প্রশ্নগুলো এখনও মানসিকভাবে আঘাত করে।’ 

করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রিয়াংকা দে জানান, ‘আমি কয়েক দিন ক্যারিয়ারে বিরতি নিয়েছিলাম। সেই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না, কিন্তু তখন সন্তানের প্রয়োজনটাই বড় ছিল। এখন আবার কাজে ফিরেছি, নতুনভাবে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।’ 

মাতৃত্ব নারীর জীবনের এক গভীর ও সুন্দর অধ্যায়। আবার কর্মজীবন নারীর পরিচয়, আত্মসম্মান ও স্বপ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার চাপ নয়, বরং দুটোকেই সম্মান করার পরিবেশ তৈরি করাই সময়ের দাবি। কর্মজীবী নারীর মাতৃত্বকালীন বাস্তবতা বোঝা, সহানুভূতিশীল নীতি গ্রহণ এবং পারিবারিক সহযোগিতাই পারে এই পথকে আরও সহজ ও মানবিক করে তুলতে। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   ভারসাম্যের পথ  কর্মজীবী নারী 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: