বদলে যাওয়া সময়

নিবেদিতা দাস

কিশোরী বয়স মানেই হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া। শরীর বদলায়, মনের ভেতর প্রশ্ন বাড়ে, চারপাশের প্রত্যাশাও পাল্টে যেতে থাকে। একদিকে স্কুল,

2026-01-28T03:41:15+00:00
2026-01-28T03:41:15+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বদলে যাওয়া সময়
কিশোরী হওয়ার দিনগুলো
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
কিশোরী বয়স মানেই হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া। শরীর বদলায়, মনের ভেতর প্রশ্ন বাড়ে, চারপাশের প্রত্যাশাও পাল্টে যেতে থাকে। একদিকে স্কুল, কোচিং আর পরীক্ষার চাপ, অন্যদিকে পরিবার ও সমাজের চোখে ‘ভালো মেয়ে’ হয়ে ওঠার দায়িত্ব। এই বয়সটা হচ্ছে এক ধরনের রূপান্তরের সময়। 

নবম শ্রেণির ছাত্রী মুলতাজিম মুনিরা বলছে, ‘হঠাৎ সবাই বড়দের মতো ব্যবহার আশা করে। আবার কোথাও গেলে বলে, তুমি তো এখনও ছোট। এই দ্বন্দ্বটাই সবচেয়ে কষ্টের।’ 

আজকের কিশোরীরা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি জানে, আবার অনেক বেশি বিভ্রান্তও হয়। সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন জগৎ তাদের সামনে যেমন নতুন সুযোগ খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন চাপ। কার সঙ্গে মিশবে, কেমন পোশাক পরবে, কীভাবে কথা বলবে- এসব নিয়েই শুরু হয় নীরব তুলনা আর আত্মসন্দেহ। 

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘এই বয়সে তুলনা সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের কারণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাইকে নিখুঁত মনে হয়, ফলে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে আত্মসম্মানবোধে আঘাত করে। সবসময় ভালো থাকতে হবে- এ চাপটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর। কিশোরীদের অনুভূতিকে ছোট করে দেখা হয় এ সময়। দুঃখ, রাগ বা হতাশা প্রকাশ করাও কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের অংশ। 

ডা. মো. রাশেদুল হকের মতে, ‘অভিভাবকরা যদি শরীর ও মানসিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করেন, তা হলে মেয়েরা নিজেকে অস্বাভাবিক ভাববে না। এ সময় যদি মেয়েদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা হলে তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখার অনুমতি দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। 

শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়টি কিশোরীদের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর। মাসিক, উচ্চতা বা ওজন বৃদ্ধি, ব্রণ- এসব নিয়ে অনেকেই সংকোচ বোধ করে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে না পারলে তারা উত্তর খোঁজে ইন্টারনেটে বা বন্ধুদের কাছ থেকে, যা সবসময় সঠিক হয় না। এই সময়টায় মা-বাবার খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ খুব জরুরি। ভয় বা লজ্জা নয়, বিশ্বাস তৈরি করাই বড় সহায়তা। 

একাদশ শ্রেণির ছাত্রী নাবিলা জানায়, ‘প্রথম পিরিয়ডের সময় খুব ভয় পেয়েছিলাম। মাকে কিছু বলতে লজ্জা লাগছিল। পরে বুঝেছি, যদি তখন কেউ শান্তভাবে বুঝিয়ে দিত, ভয়টা এত বেশি লাগত না।’ 

মানসিক দিক থেকেও এই বয়স ভীষণ নড়বড়ে। পরীক্ষার ফল, বন্ধুত্ব ভাঙা, সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলনা- সব মিলিয়ে অনেক কিশোরী নিজের অজান্তেই মানসিক চাপে পড়ে। কাউকে না জানিয়ে চুপচাপ কষ্ট সহ্য করার প্রবণতা মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ভালো থাকতে হবে এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। 

এক কিশোরীর মা নার্গিস আক্তার বলেন, ‘আমাদের সময় মা-মেয়ে পিরিয়ড বা শারীরিক কোনো পরিবর্তন নিয়ে কথা বলত না। কিন্তু এখন বুঝি, না বললেই সমস্যা বাড়ে। এখন মেয়ের মন খারাপ দেখলে আগে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? সমাধান দিতে না পারলেও অন্তত শুনি। এতে ও সাহস পায়।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘সব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মেয়েরা চুপ হয়ে যায়। আমি ওর বন্ধু, পড়াশোনা বা অনলাইন জগৎ নিয়ে কোনো ধরনের ভয় দেখানোর চেষ্টা করি না। বরং বলি, ভুল করলে আমাকে বলবে। কারণ আমি মনে করি ভয় পেলে তারা সবচেয়ে বেশি একা হয়ে পড়ে।’ 

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিভাবকীয় মনোভাব কিশোরীদের মানসিক নিরাপত্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। শিক্ষা এখনও কিশোরীদের জীবনের বড় ভরসা। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ কতটা আছে, সেটিও প্রশ্ন। অনেক মেয়েই বিজ্ঞান, খেলাধুলা বা সৃজনশীল পেশায় যেতে চাইলেও পরিবার বা সমাজের ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। অথচ সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এ বয়সেই তৈরি হতে পারে আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি। 

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী চর্যা মধুরিমা বলে, ‘আমি খেলাধুলা ভালোবাসি। কিন্তু সবাই বলে, এটি মেয়েদের জন্য না। তখন নিজের স্বপ্নটাই ছোট মনে হয়।’ 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আজকের কিশোরীদের জন্য আরেক বড় বিষয়। অনলাইনে পরিচয়, ছবি শেয়ার, সাইবার বুলিং- এসব ঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেই পুরোপুরি সচেতন নয়। 

স্কুল ও পরিবার যদি একসঙ্গে দায়িত্ব নেয়, তা হলে কিশোরীরা নিরাপদে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখতে পারে, ভয় নয় বরং সচেতনতা নিয়ে। 

দ্বাদশ শ্রেণির আরেক ছাত্রী প্রমা চৌধুরী বলেন, ‘অনলাইনে কে ভালো, কে খারাপ- এটি বুঝতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।’ 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতনতা তৈরি করেই কিশোরীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখানো উচিত। স্কুল ও পরিবার একসঙ্গে দায়িত্ব নিলে প্রযুক্তি তাদের জন্য শক্তি হয়ে উঠতে পারে। 

এসবের মাঝেও কিশোরীরা শুধু সমস্যার গল্প নয়। তারা সাহসী, কৌতূহলী এবং বদলে যাওয়ার শক্তি রাখে। বই পড়া, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবী কাজ বা ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক কিশোরীই নিজের জায়গা তৈরি করছে। প্রয়োজন শুধু একটু ভরসা, একটু শোনার সময়। কিশোরীদের নিয়ে কথা বলতে গেলে উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা আমাদের বেশি। কিন্তু এই বয়সে সবচেয়ে দরকার বোঝাপড়া। 

তারা নিখুঁত হতে চায় না, তারা চায় গ্রহণযোগ্য হতে। কিশোরীদের গল্প মানে তাই শুধু বয়সের কথা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নারীদের বেড়ে ওঠার গল্প। এই গল্প যত যত্ন নিয়ে বলা যাবে, সমাজও ততটাই সমৃদ্ধ হবে। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   বদলে যাওয়া সময়  কিশোরী হওয়া  দিনগুলো 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: