প্রকাশ: বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৪৭ এএম
ছবি : সময়ের আলো রাজশাহীর একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা রীমা খাতুনের গল্প হঠাৎ কোনো সাফল্যের নয়। এটি সময়, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা আর নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ফসল। গহনা তৈরি আজ তার পরিচয় হলেও এই যাত্রার শুরু হয়েছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে ২০১৫ সালে রীমা খাতুন ঢাকায় পা রেখেছিলেন চাকরির খোঁজে। মামার বাসায় থেকে একের পর এক ইন্টারভিউ দেন। উদ্দেশ্য ছিল আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো একটি সম্মানজনক চাকরি। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় একদম ভিন্ন পথে।
রীমার এই পথচলার গল্পটা শুরু হয়েছিল এক অভাবকে জয় করার মধ্য দিয়ে। ২০১৬ সালে তিনি ‘নাগরিক উদ্যোগ’ নামে একটি এনজিওতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ, গান, নাটক এবং আঁকাও শেখাতেন তিনি। শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে করতে মানবিক দায়বদ্ধতা আরও গভীর হয়। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানে শিশুদের নাচ পরিবেশনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নাচের জন্য প্রয়োজনীয় গহনার কোনো বাজেট ছিল না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জীবনের প্রথম মঞ্চে উঠতে যাওয়া শিশুদের যদি নাচের কোনো গহনা না থাকে সেটি কেমন দেখায়? এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি রীমা।
ছোটবেলায় রাজশাহী থাকতে শখের বশে বড় আপুদের দেখে শেখা পুঁতির কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান তিনি। প্রতিবেশীর কাছ থেকে পুঁতি ও সুঁই-সুতা চেয়ে নিয়ে তৈরি করেন ১৪ জন শিশুর নাচের ফুলসেট গহনা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে শিশুরা রীমার তৈরি গহনা পরে মঞ্চে ওঠে এবং তাদের পারফরম্যান্সও প্রশংসিত হয়। গহনাগুলোর দিকেও নজর পড়ে সবার। অফিসের বস থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত অতিথিরা মুগ্ধ হয়ে যান তার এই সৃজনশীলতায়। মূলত সেই দিনটিই ছিল রীমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ।
তার বস তখন বলেন, এই শিশুদের গহনা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে এবং প্রয়োজনে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। সেখান থেকেই শুরু- সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে গহনা তৈরির প্রশিক্ষণ ও বিক্রি। যদিও এনজিওর নিয়ম অনুযায়ী প্রচারের সুযোগ ছিল না, তবু কাজ থেমে থাকেনি।
চাকরি জীবনের এক পর্যায়ে ২০২০ সালে তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ঠিক সে সময়েই শুরু হয় করোনা মহামারি। চারদিকের স্থবিরতার মাঝে নারীদের ঘরবন্দি জীবনে গতি ফেরাতে এবং আয়ের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে তৎকালীন সচিব ড. আবুল হোসেন শুরু করেন ‘সেট প্রোগাম ফর ওমেন’। রীমা এখানে গহনা তৈরির প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান। অনলাইনে বিনামূল্যে হাজার হাজার নারী তার কাছ থেকে গহনা তৈরির হাতেখড়ি নেন। এখান থেকেই তার কাজ নতুন মাত্রা যোগ হয়। ২০২১ সালে মন্ত্রণালয়ের এক বছরের একটি বিশেষ অনুদান প্রকল্পে যুক্ত হয়ে তিনি সারা দেশের নারীদের দক্ষ করে তোলার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেন।
সেই সময়ে তিনি চালু করেন নিজের উদ্যোগ ‘আয়নাবিবির গহনা’। শিক্ষার্থীদের অনুরোধে শুরু করেন অ্যাডভান্স ও সরাসরি কোর্স। ময়মনসিংহ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, নরসিংদী, সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্তে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। বর্তমানে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর ও রামপুরায় চারটি স্পটে তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছেন। অনলাইনেও রয়েছে বড় ট্রেনিং কমিউনিটি।
রীমা খাতুন প্রশিক্ষণ দিতে গিয়েই নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অনেক নারী কাজ শিখলেও বিক্রির জায়গা খুঁজে পান না। তখন তিনি নেন ভিন্ন সিদ্ধান্ত- শুধু শেখানো নয়, বিক্রির দায়িত্বও নেবেন নিজেই। আজ লুমবিডিং, রেজিন, ফেল্ট জুয়েলারি বা ব্রেক স্টিচের মতো কঠিন সব গহনা তৈরিতে তার শিক্ষার্থীরা পারদর্শী। দেশের বড় উদ্যোক্তা মেলা ও বায়ার মিটআপ থেকে শুরু করে বিদেশের বাজারেও তার শিক্ষার্থীদের তৈরি গহনা পৌঁছে যাচ্ছে রীমার মাধ্যমে।
বর্তমানে রীমার সঙ্গে যুক্ত আছেন ৩০০ থেকে ৫০০ দক্ষ নারী কারিগর। তারা ঘরে বসে গহনা তৈরি করে রীমাকে পাঠিয়ে দেন এবং কুরিয়ার পাওয়ার পরপরই বিকাশে তাদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া ‘ছায়াতল বাংলাদেশ’ সহ আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ২০২৩ সালে জয়িতা ফাউন্ডেশন থেকে অনুদান পেয়ে তিনি কয়েক হাজার নারীকে স্বাবলম্বী করেছেন। কোনো চাপ নয়, ধীরে এগোনোর সুযোগ- এই মানবিক মডেলেই চলছে তার উদ্যোগ।
রীমা খাতুন এখন আর শুধু নিজের লাভের কথা ভাবেন না। তার কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সেসব সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং অবহেলিত নারী, যারা ঘরে বসে কিছু করতে চায়।
রীমা খাতুনের লক্ষ্য কখনো বড় ব্র্যান্ড হওয়া নয়; তার লক্ষ্য নারীদের হাতে সম্মানের আয় তুলে দেওয়া। তিনি মনে করেন, চাপ দিয়ে কোনো কাজ করানো যায় না। তারা তাদের সুবিধামতো কাজ করে, যেন সংসার সামলে নিজেরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।
পুঁতির সুতোয় যেমন একেকটি গহনা গড়ে ওঠে, তেমনি তার হাতে গড়ে উঠছে অসংখ্য নারীর আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন। রাজশাহীর সেই সাধারণ মেয়েটি আজ তার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে পুঁতির মালায়ও স্বপ্নের মালা গাঁথা যায়।
রীমা খাতুন আজ হাজারো নারীর কাছে এক ‘আয়না’, যেখানে তারা নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। তিনি কয়েক হাজার নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা। তার গড়ে তোলা ‘আয়না বিবির গহনা’ আজ শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, শত শত নারীর আয়ের এক নির্ভরতার নাম।
সময়ের আলো/এনএ