চীন ও জাপানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি লি জে-মিয়ুং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচির সঙ্গে জাপানের নারায় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। এই উত্তেজনাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া এখন কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে।
বৈঠকে লি বলেন, কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে অতীতে কঠিন ইতিহাস থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এখন দুই দেশ নতুন একটি অধ্যায় শুরু করছে। তিনি বলেন, বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। লি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও স্থিতিশীল হবে।
চীনের সঙ্গে লির বৈঠক এবং ভারসাম্যের চেষ্টা
এই বৈঠকের মাত্র এক সপ্তাহ আগে লি জে-মিয়ুং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম কোনো দক্ষিণ কোরিয়ান রাষ্ট্রপতি চীন সফর করলেন। এই সফরে লির সঙ্গে একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলও ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, লি চীন ও জাপান—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে চাইছেন।
লি সাংবাদিকদের বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া এখন চীন ও জাপানের মাঝখানে অবস্থান করছে। ভুল সময়ে কোনো পক্ষ নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই পরিস্থিতি বুঝে এবং সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
কেন চীন ও জাপানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে
নভেম্বর থেকে চীন ও জাপানের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেন, যদি চীন তাইওয়ানে হামলা চালায়, তবে সেটিকে জাপানের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। চীন এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও জাপান তা মানেনি।
এরপর চীন দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। জাপানে ভ্রমণের বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক করে, জাপানি বিনোদনের ওপর অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং জাপানি সামুদ্রিক খাবার আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে—এমন ৮০০টির বেশি পণ্যের রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে।
চীনা গণমাধ্যম জানায়, চীন বিশ্বের বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’-এর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা বৈশ্বিক শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই চীন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারছে।
জাপানের পাল্টা উদ্যোগ
চীনের এই পদক্ষেপের জবাবে জাপান দক্ষিণ কোরিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। জাপানের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান এখন বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে মিলেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান ও কৌশল
দক্ষিণ কোরিয়া চীনের একটি বড় অর্থনৈতিক অংশীদার হলেও রাজনৈতিকভাবে নিজেকে একটি “মধ্যম শক্তি” হিসেবে দেখছে। লির সরকার চীন ও জাপানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে বাস্তবসম্মত কূটনীতি অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কও জোরদার রাখছে।
লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তাই অকারণ দ্বন্দ্ব এড়িয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। এমনকি চীন-জাপান উত্তেজনার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসা ও ভোক্তা বাজার কিছুটা লাভবানও হতে পারে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
লি ও তার সরকার যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ থাকতে চায়। তারা চায় দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি নিরাপদ থাকুক এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় থাকুক। এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে, “মধ্যম পথ” কূটনীতির মাধ্যমে লি জে-মিয়ুং দক্ষিণ কোরিয়াকে চীন ও জাপানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত করতে চাইছেন। এর ফলে দেশটি শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তি কূটনৈতিক প্রভাবও অর্জন করছে।
/ইউএমএইচ