ইরানে চলমান সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান দমনে দেশটির শাসকগোষ্ঠী ক্রমেই কঠোর ও নির্মম পথে হাঁটছে। সেই দমন-পীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে ২৬ বছর বয়সী তরুণ বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তিনিই হতে পারেন প্রথম ব্যক্তি, যাকে আন্দোলন দমনের জন্য প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
কে এই এরফান সোলতানি?
এরফান সোলতানি মধ্য ইরানের ফারদিস শহরের একজন সাধারণ নাগরিক। পেশায় তিনি ছিলেন একজন পোশাক দোকানদার। পরিবার ও পরিচিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না বা সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা ও নাগরিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই তিনি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার দাবিতে স্লোগান দেওয়াই ছিল তার একমাত্র ভূমিকা। অথচ সেই স্লোগানই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার
গত ৮ জানুয়ারি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে এরফান সোলতানিকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা বাহিনী। গ্রেফতারের পর তাকে কোথায় রাখা হয়েছে—এ বিষয়ে কয়েক দিন পর্যন্ত পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটিও শুরুতে স্পষ্ট করা হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারের মাত্র দুদিনের মধ্যেই একটি সংক্ষিপ্ত ও গোপন বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ১১ জানুয়ারি একটি আদালতের শুনানির পর তাকে ‘মোহারেবেহ’—অর্থাৎ ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। ইরানে এই অভিযোগ সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এরফান সোলতানির বিচার ছিল সম্পূর্ণ অন্যায্য। তাকে কোনো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল না এবং পরিবার বা আইনজীবীদের বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এরফানের বোন একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবী হলেও তাকে মামলার নথিপত্র দেখতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, সে সম্পর্কেও পরিবার কিছুই জানে না।
পরিবারকে শেষ মুহূর্তে জানানো হয়
গ্রেফতারের চার-পাঁচ দিন পর হঠাৎ করেই কর্তৃপক্ষ এরফানের পরিবারকে ফোন করে জানায় যে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে জানানো হয়, ফাঁসির দিন সকালে পরিবারকে তার সঙ্গে মাত্র ১০ মিনিট দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তারা জানতেনই না এরফান জীবিত আছেন কি না। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ডের খবর তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।
প্রকাশ্যে ফাঁসির আশঙ্কা
হেঙ্গা অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসসহ একাধিক মানবাধিকার সংগঠন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, সরকার জনমনে ভয় ছড়াতে এরফান সোলতানিকে প্রকাশ্যে শহরের কোনো চত্বরে ফাঁসি দিতে পারে। তাদের মতে, এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার বিষয় নয়, বরং পুরো আন্দোলন দমনের কৌশল।
সংগঠনগুলো বলছে, এমন প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।
ইরানে চলমান দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান আজ ১৮তম দিনে প্রবেশ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দশ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ইরানে ভিন্নমত দমনে সরকারের কঠোর নীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
এরফানের মৃত্যুদণ্ডের খবরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন দেশের অধিকারকর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে এই রায় স্থগিত করা, ন্যায্য পুনর্বিচার নিশ্চিত করা এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এরফান সোলতানির ভাগ্য এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং ইরানে চলমান আন্দোলন এবং মানবাধিকারের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
/ইউএমএইচ