মুসলিম নিপীড়নের পাশাপাশি উগ্র ভারতীয়দের টার্গেট এখন খ্রিস্টান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় সহিংসতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে দেখা যাচ্ছে। দেশটির উগ্রপন্থিদের ‘ঘৃণা বক্তব্য’ বা হেট স্পিচ ভয়াবহ রূপ

2026-01-19T18:54:10+00:00
2026-01-19T18:54:10+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মুসলিম নিপীড়নের পাশাপাশি উগ্র ভারতীয়দের টার্গেট এখন খ্রিস্টান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫৪ পিএম 
ক্রিসমাসের সময় ভারতের জম্মুর সেন্ট মেরিস গ্যারিসন গির্জায় খ্রিস্টানরা। ছবি : সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় সহিংসতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে দেখা যাচ্ছে। দেশটির উগ্রপন্থিদের ‘ঘৃণা বক্তব্য’ বা হেট স্পিচ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর পার্শ্ববর্তী দেশটিতে ভ্রান্থ তথ্য ছড়িয়ে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চলতে দেখা যায়। তবে এখন মুসলিমদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। 

গেল বছরের বড়দিনের উৎসবকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে খ্রিস্টানদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটলেও নীরব ভূমিকায় দেখা গেছে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে। 

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমকর্মী কোনাল পুরোহিত এই প্রতিবেদনে ভারতে ধর্মীয় সহিংসতা সংখ্যালঘু মুসলিম থেকে শুরু করে কীভাবে খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পর্যন্ত ছড়াচ্ছে তার আদ্যোপান্ত তোলে ধরেছেন। 

বড়দিনে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নীরবতা

গত বড়দিনের আগে ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো অভিযোগ তোলে,  খ্রিস্টানরা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ করাচ্ছে। বড়দিনের আগের সন্ধ্যায় সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ডাক দেয়। যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি কট্টরপন্থী হিন্দুরা। ওই দিনই লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল যুবক রায়পুরের একটি শপিং মলে হামলা চালিয়ে বড়দিনের সাজসজ্জা ভাঙচুর করে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্তি পায় এবং কারাগারের বাইরে তাদের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।

মুম্বাইয়ের ভারতজুড়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়, গির্জা এবং প্রতিষ্ঠানের উপর হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে লোকেরা প্ল্যাকার্ড ধরে আছে। ছবি : এপি

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির একটি গির্জায় বড়দিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও দেশজুড়ে খ্রিস্টানদের ওপর হওয়া এসব সহিংসতার বিষয়ে কোনো নিন্দা জানাননি।

তদন্তে এসেছে ভয়াবহ তথ্য

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ)-এর প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে মোট ১,৩১৮টি ‘ঘৃণা বক্তব্যের’ ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই হিসাবে ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৩টির বেশি এ ঘটনা ঘটছে।


প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ঘৃণা বক্তব্যের হার ৯৭ শতাংশ এবং এ হিসাব ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। বছরের শুরুর দিকে মুসলিমরা প্রধান লক্ষ্যবস্তু থাকলেও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ৪১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে হওয়া ১১৫টি ঘটনা ২০২৫ সালে বেড়ে ১৬০ ছাড়িয়েছে।

দেশজুড়ে যত হয়রানি ও ষড়যন্ত্র

বিজেপির এক নেতার নেতৃত্বে মধ্যপ্রদেশে দৃষ্টিহীন শিশুদের একটি বড়দিনের মধ্যাহ্নভোজে হামলা চালানো হয়। দিল্লিতে ‘সান্তা টুপি’ পরা নারীদের হেনস্তা করা এবং কেরালায় আরএসএস কর্মীর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে বড়দিনের অনুষ্ঠান না করার হুমকি দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২.৩ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ১৪.২ শতাংশ মুসলিম। ১৯৫১ থেকে ২০১১ সালের আদমশুমারি পর্যন্ত খ্রিস্টানদের সংখ্যা কোনোদিন ৩ শতাংশ ছাড়ায়নি বলে বিশেষজ্ঞদের। তা সত্ত্বেও উগ্রবাদীরা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’-এর মতো ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তথ্য ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিচ্ছে।

মুসলিমদের যেভাবে অভিযুক্ত করা হয়

এই ঘৃণ্য ঘটনাগুলোতে বক্তারা প্রায় বিজেপি বা অনুমোদিত হিন্দু আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন তত্ত্ব আহ্বান করে বলেন যে, মুসলমানরা হিন্দু ভূমি দখল করছে। এ দিক থেকে মুসলমানরা ‘ভূমি জিহাদ’ করছে বলে অভিযোগ তোলে গোষ্ঠীগুলো। মুসলমানরা কৌশলগতভাবে হিন্দুদের চেয়ে বেশি জনসংখ্যায় পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে বলা হয় ‘জনসংখ্যা জিহাদ’ করছে তারা। এছাড়া মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের ইসলামে রূপান্তরিত করার প্রয়াসে প্রলুব্ধ করতে চায়। এর জন্য এটি মুসলমানদের ‘লাভ জিহাদ’।

নয়াদিল্লিতে ধর্মীয় সহিংসতায় নিহত ৩১ বছর বয়সী মুহাম্মদ মুদাসিরের মৃতদেহের কাছে আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা কাঁদছেন। ছবি : এপি

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ ধরনের ষড়যন্ত্র তথ্য ব্যবহার করে এসব ঘটনার বেশিরভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বানের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। মুসলমানদের বয়কট করা থেকে শুরু করে তাদের উপাসনালয় ধ্বংস করা, অস্ত্র তুলে নেওয়া এবং তাদের সহিংসভাবে আক্রমণ করা পর্যন্ত আহ্বানগুলো ছিল।

গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিশন এক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে নাগরিকত্ব এবং ধর্মান্তরসহ ভারতে বেশ কয়েকটি ‘বৈষম্যমূলক আইন’ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজেপি ও আরএসএসের উসকানি 

প্রতিবেদন অনুসারে, ঘৃণা বক্তব্যের ৮৮ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি বা তাদের মিত্র দল শাসিত রাজ্যগুলোতে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ঘৃণা বক্তব্যের ছড়ানোর তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে পুষ্কর সিং ধামি ৭১টি ঘৃণা বক্তব্যের ঘটনা নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।

গুজরাটের সলংপুরে একটি মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তার পাগড়ি ঠিক করছেন। ছবি : রয়টার্স  

সিএসওএইচ-এর গবেষক রকিব নায়েক বলেন, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ এবং ‘বিদেশি শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে হিন্দুদের মধ্যে কৃত্রিম ভীতি তৈরি করে সংখ্যালঘু বিরোধী আইন পাসের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।

বড় ধরনের সহিংসতার শঙ্কা

ভারতের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক রাম পুনিয়ানি সতর্ক করে বলেছেন, এই ঘৃণা বক্তব্য শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিজেপি নির্বাচনী স্বার্থে আদিবাসী ও দলিত অঞ্চলে কর্মরত খ্রিস্টান মিশনারিদের ওপর হামলা করে নিজেদের ভোটব্যাংক সংহত করার চেষ্টা করছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে সবশেষে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ছত্তিশগড়ের আর্চবিশপ তো গির্জা ও খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড়দিনের সময় পুলিশি সুরক্ষা চাওয়ার পরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।

সময়ের আলো/এসকে/


  বিষয়:   মুসলিম নিপীড়ন  উগ্র ভারতীয়  খ্রিস্টান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: