বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে গুগলে ‘বাজে রিভিউ’ প্রতারণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুর দিক। স্পেনের বাসাবদল ও মালামাল পরিবহনের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সার্ভিমুভিংয়ের ব্যবস্থাপক পাবলো সানচেজ অফিসে বসে কাজ করছিলেন।

2026-01-26T23:31:53+00:00
2026-01-26T23:31:53+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে গুগলে ‘বাজে রিভিউ’ প্রতারণা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম 
প্রতীকী ছবি
২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুর দিক। স্পেনের বাসাবদল ও মালামাল পরিবহনের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সার্ভিমুভিংয়ের ব্যবস্থাপক পাবলো সানচেজ অফিসে বসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, অনলাইনে অদ্ভুত কিছু ঘটছে। গুগল ম্যাপসে তাদের কোম্পানির পেজে একের পর এক রিভিউ আসছে সবগুলোই এক তারকা, অর্থাৎ ওয়ান স্টার। পাবলো বলেন, প্রথমে আমরা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। ভাবলাম, হয়তো কোনো গ্রাহক সেবায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আরেকটা বাজে রিভিউ এলো, তারপর আরেকটা... তখনই বুঝতে পারলাম, ব্যাপারটা স্বাভাবিক না।

খুব দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে যায়- এগুলো আসল গ্রাহকের লেখা নয়। পাবলোর ভাষায়, আমরা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর রহস্যের জট খোলে। একটি বিদেশি নম্বর থেকে তাদের কাছে বার্তা আসে। সেখানে বলা হয়, একটি কোম্পানি টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করেছে এসব নেতিবাচক রিভিউ লেখার জন্য। এখন যদি পাবলোরা ২০০ ইউরো দেন, তা হলে রিভিউগুলো মুছে ফেলা হবে। এমনকি কারা এই কাজ করাচ্ছে, তাদের নামও জানিয়ে দেওয়া হবে।

শুরুতে পাবলো কিছুটা দ্বিধায় পড়েন। প্রতারকদের সঙ্গে ফোনে কথাও বলেন। তিনি বলেন, ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, এটা একটা সংগঠিত চক্র। যেন কোনো কল সেন্টার থেকে অনেকে একসঙ্গে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত তিনি টাকা দিতে রাজি হননি। বরং প্রতিটি ভুয়া রিভিউয়ের নিচে যুক্তিসহ জবাব দেন এবং গুগলের কাছে অভিযোগ করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রিভিউগুলো মুছে যায় ঠিকই, কিন্তু তত দিনে ক্ষতি হয়ে গেছে। সার্ভিমুভিংয়ের রেটিং চার-এর নিচে নেমে আসে। পাবলোর আক্ষেপ, গ্রাহকরা তো আগে রেটিং দেখেই ফোন দেয়। তখন আমাদের বারবার বোঝাতে হয় যে, এসব মিথ্যা।

সার্ভিমুভিং একা নয়। স্পেনে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। মায়োর্কার দন্ত চিকিৎসক, অ্যালিকান্তের গাড়ির ডিলার, মালাগার চাবি নির্মাতা, মুর্সিয়ার এসি মিস্ত্রি তালিকা দীর্ঘ। তদন্তে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি মিল আছে। তাদের ওয়েবসাইট ইংরেজিতে বা তারা বিদেশি গ্রাহকদের সেবা দেয়। কিন্তু রিভিউগুলো লেখা হয় স্প্যানিশ ভাষায় এবং অভিযোগগুলো খুব নির্দিষ্ট। যেমন একটি ভুয়া প্রোফাইল থেকে লেখা হয়েছিল, ভয়াবহ সেবা। স্থানীয়ভাবে বাসা বদলানোর জন্য সার্ভিমুভিং ডেকেছিলাম। তারা সময় মানেনি, জিনিসপত্রে রুক্ষ আচরণ করেছে, দেয়ালে দাগ ফেলে গেছে। পরে প্রোফাইলটি মুছে গেলেও ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

মায়োর্কার পালমায় অবস্থিত ইউরোপিয়ান ডেন্টাল প্র্যাকটিস ক্লিনিকের কর্মকর্তা হাইডি ল্যাংকফেল বলেন, ‘ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, আমাদের ক্লিনিক সম্পর্কে তারা খুব ভালোভাবে খোঁজ নিয়েছে।’ তার সন্দেহ, এই প্রতারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করা হয়েছে। ‘রিভিউগুলোতে এমন সব কারিগরি শব্দ ছিল, যা সাধারণ কেউ জানবে না। পরে তারা লিখল- ক্লিনিক নোংরা, আগের রোগীর রক্ত চেয়ারে লেগে ছিল। একটি ব্যবসার সুনাম ধ্বংস করতে এটুকুই যথেষ্ট।’



এই ধরনের প্রতারণা নিয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল তদন্তকারী কে ডিন। তার ‘ফেইক রিভিউ ওয়াচ’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। তিনি বলেন, গুগল এখন ভুয়া রিভিউর মহাসাগর। ভালো আর খারাপ- দুই ধরনের ভুয়া রিভিউই আছে। তবে নেতিবাচক রিভিউগুলো এখন চাঁদাবাজির অস্ত্র হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ভুয়া রিভিউ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে পোস্ট করা হয়। গুগল শেষ পর্যন্ত সেগুলো মুছে দেয় ঠিকই, কিন্তু তার আগে ব্যবসায়ীদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তারা  ২৪ কোটির বেশি রিভিউ, ৭ কোটির বেশি লোকেশন এডিট  এবং ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া বিজনেস প্রোফাইল মুছে ফেলেছে বা ব্লক করেছে।

তবে বাস্তবে ব্যবসায়ীরা গুগলের সহায়তায় সন্তুষ্ট নন। অ্যালিকান্তের গাড়ির ডিলার স্টিভ বলেন, ‘গুগল খুব ধীরগতিতে কাজ করে। অভিযোগ করলে শুধু অটোমেটেড উত্তর আসে।’ পাবলোর অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, গুগলের কোনো ফোন নম্বরই নেই। কাকে ফোন করব? কার কাছে অভিযোগ করব- কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

কে ডিন জানান, প্রতারকরা ভুয়া প্রোফাইল খুলে সেগুলো ‘রেস্ট্রিকটেড’ করে রাখে, যাতে কেউ সব রিভিউ একসঙ্গে দেখতে না পায়। আমি কোনো অটোমেশন ব্যবহার করি না। শুধু চোখ আর স্প্রেডশিট দিয়ে খুঁজি। কখনো প্রতারকরা ভুল করে একটি প্রোফাইল লুকাতে ভুলে যায়- সেখান থেকেই পুরো নেটওয়ার্ক ধরা পড়ে। তিনি দেখেছেন, একই চক্র ছয়টি মহাদেশে শত শত ব্যবসার বিরুদ্ধে ভুয়া রিভিউ দিচ্ছে।

ডিন বলেন, ২০ জনের মধ্যে যদি একজনও ২০০ ডলার দেয়, তাতেই তাদের লাভ। তবে টাকা দিয়েও সমস্যা শেষ হয় না। একটি প্রতিষ্ঠান টাকা দেওয়ার এক মাস পর আবার নতুন করে ভুয়া রিভিউর শিকার হয়। অর্থাৎ, এই প্রতারণা একবার শুরু হলে তা থামে না। এটি এখন একটি চলমান ডিজিটাল চাঁদাবাজি শিল্প যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সৎ ও ছোট ব্যবসায়ীরা।

সময়ের আলো/এসকে/ 



  বিষয়:   বাংলাদেশ  পাকিস্তান  গুগল  প্রতারণা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: