কংগ্রেস নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয় সংক্রান্ত আইন অনুমোদন করতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারি ‘শাটডাউন’-এর মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই আংশিক শাটডাউনের ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল বিভাগের অর্থায়ন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারি সূত্র ও বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—ব্যয় প্যাকেজ অনুমোদনে একমত হতে না পারায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কোনো বরাদ্দ বিল কার্যকর হতে হলে দুই কক্ষের অনুমোদনের পর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।
কোন কোন বিভাগ প্রভাবিত
এই শাটডাউনের ফলে প্রতিরক্ষা বিভাগ, পররাষ্ট্র দফতর, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগসহ সরকারের বড় অংশের কার্যক্রম আংশিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। যদিও সপ্তাহান্তে অধিকাংশ ফেডারেল দফতর সীমিতভাবে পরিচালিত হয়, তবুও দীর্ঘমেয়াদি শাটডাউন হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।
সিনেটে পাস, হাউসে আটকে থাকা বিল
শুক্রবার মার্কিন সিনেট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত অর্থায়নের একটি বিল অনুমোদন করে। পাশাপাশি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ সচল রাখতে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী তহবিল ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।
এই স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মূলত অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর জন্য আইনপ্রণেতাদের অতিরিক্ত সময় দিতে। তবে পুরো ব্যয় প্যাকেজটি এখনও প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। হাউস বর্তমানে সোমবার পর্যন্ত অবকাশে থাকায় ভোট প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
অভিবাসন ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তেজনা
এই শাটডাউনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিবাসন ইস্যু। চলতি মাসের শুরুতে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর পরপরই ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন প্রয়োগ নীতিতে সংস্কার না আনা পর্যন্ত বৃহত্তর ব্যয় চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও আবাসন খাত অন্তর্ভুক্ত করে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি ব্যয় বিল পাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল কংগ্রেস। কিন্তু মিনিয়াপোলিসের ঘটনার পর সেই সমঝোতা ভেস্তে যায়।
আইসিই সংস্কার নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের দাবিসমূহ
ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অভিযানের সময় মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ করা
বডি ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা
বাড়িতে প্রবেশ ও ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত নিয়ম কঠোর করা
‘রোভিং প্যাট্রোল’ বন্ধ করা
বলপ্রয়োগের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন
অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
মিনিয়াপোলিসের ঘটনার পর এসব প্রস্তাব কিছু রিপাবলিকান সদস্যের মধ্যেও সীমিত আগ্রহ সৃষ্টি করলেও দলটির বড় অংশ এখনো এর বিরোধিতা করছে।
রিপাবলিকানদের অবস্থান
সিনেটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের আসন বেশি। ফলে হাউসে বিল পাস করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। হাউস স্পিকার মাইক জনসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ হওয়ায় কট্টরপন্থী রিপাবলিকান গোষ্ঠী—বিশেষ করে হাউস ফ্রিডম ককাস—বিলটির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতা চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটনে ফিরলেই ভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
শাটডাউন কতটা দীর্ঘ হতে পারে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রতিনিধি পরিষদ দ্রুত ভোটে যায়, তাহলে শাটডাউনের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে সমঝোতা না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে—যাকে ‘শাটডাউন’ বলা হয়। দেশটির ইতিহাসে এ পর্যন্ত ১৮ বার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ শাটডাউন হয়েছিল গত বছরের অক্টোবরে।
/ইউএমএইচ