দ্বীপঘেরা সন্দ্বীপে রাজনীতি মানেই স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর আবেগের জটিল মেলবন্ধন। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সেই সন্দ্বীপ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এক সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা মোস্তফা কামাল পাশা। চট্টগ্রাম–৩ আসনে সাবেক এই সংসদ সদস্যকে প্রার্থী করায় বিএনপি একদিকে যেমন স্বস্তিতে, অন্যদিকে ঠিক তার বিপরীতে নতুন মুখ নিয়ে মাঠে নেমে জামায়াতে ইসলামী পড়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে। দ্বীপের ভোটের হিসাব, রাজনৈতিক ইতিহাস আর বর্তমান বাস্তবতা—সব মিলিয়ে সন্দ্বীপে এবারের লড়াই হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতা বনাম পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা ঘিরে শুরুতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। গত ৩ নভেম্বর দলটির প্রথম দফায় ঘোষিত ২৩৭টি আসনের তালিকায় সন্দ্বীপের নাম না থাকায় নানা গুঞ্জন ছড়ায়। মূলত একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী ও দলীয় অন্তঃকোন্দলের কারণেই প্রার্থী ঘোষণা পিছিয়ে যায়। প্রায় এক মাস পর, ৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফার ঘোষণায় সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশাকে প্রার্থী করে বিএনপি। অভিজ্ঞ ও প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে সামনে আনতেই অনেকটা নির্ভার হয়ে পড়ে দলটি।
হেভিওয়েট প্রার্থী দিয়ে স্বস্তিতে বিএনপি
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা সন্দ্বীপ রাজনীতিতে পরিচিত ও পরীক্ষিত নাম। তিনি এই আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার রাজনৈতিক যাত্রা তাকে তৃণমূলে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি, তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবারও সক্রিয় হয়েছেন।
নিজের শারীরিক অবস্থা ও রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ২০১৮ সালে তার হার্টবিট ড্রপ করছিল, পরে পেসমেকার স্থাপন করা হয়। তবে সন্দ্বীপের মানুষই তাকে আবার নির্বাচনে নামতে বাধ্য করেছেন। এমনকি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে লোক পাঠিয়ে অনুরোধ করেন—মনোনয়ন পাওয়ার পর যেন তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা না বলেন।
এ আসন মূলত বিএনপির দূর্গ। মাঠে ব্যাপক নেতাকর্মী ও সমর্থক। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, তিনবারের প্রভাবশালী এমপি, প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নেতা মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহীকমিটির সদস্য ও সন্দ্বীপ উপজেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সভাপতি।
প্রথম জীবনে একটানা ২৫ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি সমগ্র সন্দ্বীপে ব্যাপক পরিচিত। পারিবারিক ঐতিহ্য ও দানশীলতায় অনন্য অগ্রগণ্য।
নির্বাচিত হলে দুর্নীতি বন্ধসহ নির্বাচনী আসনে উন্নয়নমূলক কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি বলেন, আমার প্রথম কাজ হবে সব সেক্টর থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা। দুর্নীতি বন্ধ হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাবে। এর সঙ্গে জনগণের সেবা দানকারী সব প্রতিষ্ঠান; যেমন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্কুল, কলেজ, ভূমি অফিস, থানার সেবার মান এখন যা আছে তার চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন উচ্চশিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা এবং নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারে সে পরিকল্পনা নেব।’
নতুন মুখ নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে জামায়াত
বিএনপির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমীর আলাউদ্দিন শিকদারকে। দলীয় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তিনি প্রায় ১০ মাস ধরে সন্দ্বীপে নিয়মিত উপস্থিত থেকে প্রচারণা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। শুরুতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখছিল জামায়াত। তাদের ধারণা ছিল, মোস্তফা কামাল পাশা প্রার্থী না হলে বিএনপির অন্য তিন প্রত্যাশীর মধ্যে সমঝোতা হবে না। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোটের সমীকরণ বদলাতে চেয়েছিল দলটি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রবীণ এই নেতা প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভেতরের বিভাজন দৃশ্যত কমে গেছে। ফলে জামায়াতের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। কারণ আলাউদ্দিন শিকদার এর আগে কখনো সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।
তবে নিজের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী জামায়াত প্রার্থী বলেন, নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা এখন ভিন্ন। মানুষ আর শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিচার করছে। তার মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি কোনো চাপ অনুভব করছেন না।
মুহম্মদ আলাউদ্দিন সিকদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। ইসলামী ছাত্র শিবির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি, সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম জেলার আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য। এছাড়াও সন্দ্বীপের অনেকগুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় এবং অসাধারণ মেধাবী ব্যক্তিত্ব। সন্দ্বীপের বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালা এবং সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারের অন্যতম উদ্যোক্তা। স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণের তিনি ছিলেন মাঠের নেতা ও সাহসী সেনানী। ৫ আগস্ট উত্তর সন্দ্বীপে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় যে, নারী ভোটারদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সাধারণ মানুষের একাংশের বদ্ধমূল ধারণা পুরনো প্রার্থীর বদলে নতুনকে নির্বাচিত করা মঙ্গল হবে।
ভোটের মাঠ ও পরিসংখ্যান
দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সন্দ্বীপ উপজেলার আয়তন ৭৬২.৪২ বর্গকিলোমিটার। এখানে বসবাস করেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ। মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ২৫ হাজার ১৭ জন এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৩ জন। নারী ভোটারের এই বড় অংশ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সন্দ্বীপের ভোটের ইতিহাসও বেশ দোলাচলের। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি, ২০০১ ও ২০০৮ সালে এই আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। বিশেষ করে ২০০৮ সালে সারা দেশে বিএনপি–জামায়াত জোটের ভরাডুবির মধ্যেও সন্দ্বীপ ছিল ব্যতিক্রম।
পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রিমুখী হিসাবের আড়ালে মূল লড়াই।
অন্যান্য প্রার্থীদের অবস্থান
এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে আমেরিকা প্রবাসী ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোয়াহেদুল মাওলাও মাঠে । তবে সব হিসেব মিলিয়ে মূল লড়াই যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা স্পষ্ট।
হাতপাখা প্রার্থী অধ্যাপক আমজাদ হোসাইন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ধারী। চট্টগ্রামের একটি কলেজে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ইসলামী আন্দোলনের চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের নেতা। সন্দ্বীপের বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে দান অনুদানে তিনি সম্পৃক্ত আছেন। সন্দ্বীপে কওমী ঘরানার দৃশ্যমান একটি অবস্থান আমজাদের অনুকূলে রয়েছে। হাতপাখার কর্মী সমর্থক জামায়াতের জন্যে বিরাট টেনশন।
অন্যদিকে ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোয়াহেদুল মাওলা আপাতত কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে হয়তো আরও উদ্যোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। তিনি একজন খ্যাতিমান চার্টার্ড একাউন্টেন্ড ও সন্দ্বীপের বনেদি পরিবারের সন্তান।
নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, তোড়জোড়ও বাড়ছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত, ভোটারেরা নীরব। সংখ্যালঘু, নারী ও নতুন ভোটার এবার বিরাট ফ্যাক্টর। সকল সূচকে বিএনপি এখনো এগিয়ে রয়েছে। তবে জামায়াতের সুশৃঙ্খল প্রচার অভিযান ও বিভিন্ন ফ্যাক্টরগুলো এগিয়ে নিতে পারলে ফলাফলে চমক আসতেও পারে।
সবশেষে বলা যায়, সন্দ্বীপের ভোটের মাঠে একদিকে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করা বিএনপি, অন্যদিকে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে উঠে আসতে চাওয়া জামায়াত। দ্বীপবাসী শেষ পর্যন্ত কাকে আস্থা দেয়—অভিজ্ঞতাকে, নাকি নতুন প্রতিশ্রুতিকে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/জোআই/