রংপুর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঠাকুরগাঁও। ভোরবেলা হালকা কুয়াশায় ঢাকা শহর থেকে যাত্রা শুরু করলে চোখে পড়ে রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, খাল এবং ছড়ানো দোকানপাট। দূরত্ব কমার সঙ্গে সঙ্গে শহরের জীবনও ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। দিনের আলো পুরোপুরি ফুটার আগেই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কর্ণফুলী বাজারে ভিন্ন রকম এক হাট বসে—এখানে সবজি বা চাল-ডাল নয়, মানুষই পণ্য। ধান কাটা শ্রমিক, নির্মাণকর্মী, কাঠমিস্ত্রি—সকলেই এখানে অপেক্ষা করছেন।
এই শ্রমিকদের জীবনে ভোট হলেও বেশি কিছু বদলে না। তবুও কৃষি শ্রমিক আব্দুল খালেক বলেন, ভোট গরিবের জন্য নয়। আমাদের জীবন তো একই থাকে। এই কথায় লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্লান্তি ও হতাশা। তবে নির্বাচন নিয়ে আলাপও থেমে থাকে না, কারণ ঠাকুরগাঁও-১ আসন এখন দুই প্রার্থীর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ : একজনের শেষ, আরেকজনের প্রথম।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা দেশের অন্যতম বৃহৎ—২২টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এখানে ভোটার চার লাখ ৮৭ হাজার ১৭৫, সংখ্যালঘু এক লাখ ১৯ হাজার এবং নতুন ভোটার এক লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। সংখ্যালঘু, নতুন এবং ভাসমান ভোটাররা আসনটির ফলাফলের মূল নিয়ামক বলে মনে করছেন অনেকে।
এই আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িত। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি বিএনপির হয়ে এই আসনে নির্বাচন করেছেন, বহুবার কারাভোগ করেছেন। এবার বয়সের কারণে এটিকে নিজের শেষ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে ভোট চাইছেন। নির্বাচনী প্রচারে তার পাশে আছেন স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা। সাধারণ মানুষ তাকে এখনও ‘প্রিয় স্যার’ নামে চেনে। গ্রাম থেকে গ্রাম পর্যন্ত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভায় অংশগ্রহণ করে তিনি ভোটারদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে এখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নতুন আসনপ্রার্থী হিসেবে ভোটারদের মন জয় করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতি, স্থানীয় উন্নয়নের পরিকল্পনা, এবং চাঁদাবাজি বা গণ-মামলার বিষয়গুলোকে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার।
শহরের বাসিন্দারা আশা করছেন যে ভোট হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। কৃষক ও শ্রমিকরা জানেন ভোটের পর তাদের জীবন তেমন বদলাবে না, কিন্তু এই আসনের ফলাফলে নতুন প্রার্থী এবং অভিজ্ঞ প্রার্থী—দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্রের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করবে এলাকার ভবিষ্যৎ। মির্জা ফখরুল আশা করছেন যে শেষ নির্বাচনে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতা মানুষের বিশ্বাস জিতবে। দেলাওয়ার হোসেনের লক্ষ্য নতুন শক্তি এবং নতুন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জনগণকে আকৃষ্ট করা।
এভাবেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এই নির্বাচন প্রতিফলিত করছে একদিকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার শেষ অধ্যায়, অন্যদিকে নতুন প্রার্থীর প্রথম পদার্পণ—একই মাঠে, একসাথে, জনগণের সামনে।
/ইউএমএইচ