ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের রাজনৈতিক মাঠ চরম উত্তপ্ত ও জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। এই বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও এবার মাঠে প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যাচ্ছে। যে কোনো মূল্যে তারা ধান ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনটি ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ১০৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৪ জন। এই আসনে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ, বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম, বিএনপির স্বতন্ত্র ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজিব এবং সাবেক তিনবারের এমপি হরিণ প্রতীকের প্রার্থী ফজলুল আজিম।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সরকার পতনের পর হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাতে পারছেন না। তবে দলীয়ভাবে মাঠে সক্রিয় না থাকলেও আওয়ামী লীগের একটি বড় ভোটব্যাংক এবার প্রকাশ্যে ধানের শীষকে সমর্থন দিচ্ছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এমন একাধিক ভোটার বলেন, এখন আর লুকিয়ে থাকার সময় নাই। আমরা ধানের শীষের ভোট প্রকাশ্যেই দেব। কারণ সম্ভাব্য সরকার গঠন করবে বিএনপি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন পরে হলেও আবার রাজনীতিতে ফিরতে পারে।
স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে একাধিক বলয়ের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীকের বাইরে আরও দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে থাকায় সেই বিভাজন আরও প্রকাশ্যে এসেছে। তারা প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ভোটার ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।
একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী জানান, দলীয় প্রতীক থাকলেও মাঠে একক নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। সবাই নিজের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে দলের ক্ষতি করছেন। তাদের অভিযোগ, যাকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে হাতিয়ার দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিল না। তিনি মূলত কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ভোটের আগে দলীয় কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে হাতিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠে নেমেছে এনসিপি তথা ১১ দলীয় জোট। তারা বিশেষ করে তরুণ ভোটার, নারী ভোটার ও নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সভা, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। বিএনপির বিভক্ত অংশের কিছু নেতাকর্মীও সুযোগ বুঝে নীরবে এনসিপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এনসিপির নেতারা দাবি করছেন, হাতিয়ার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে। বড় দলগুলোর বিভাজন ও পুরনো রাজনীতির কারণে মানুষ বিকল্প খুঁজছে। হাতিয়ায় সেই বিকল্প হতে চায় এনসিপি।
এ আসনের সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিলেন। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান চান। এবার ভোটাররা শুধু প্রতীক নয়, প্রার্থী ও স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
একজন ভোটার বলেন, আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। আমরা এবার উন্নয়ন আর নিরাপত্তা চাই। দল যাই হোক, কথা দিয়ে কথা রাখে এমন মানুষ দরকার। তবে কোনো দলের ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক, তা আমরা চাই না।
ইতোমধ্যে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। শেষ মুহূর্তে জোট, সমঝোতা, দলীয় ভেতরের সমাধান কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীদের অবস্থান—সবকিছুই এই আসনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে এবারের নির্বাচন তাই শুধু ভোটের লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে তিন পক্ষের শক্তি পরীক্ষার বড় মঞ্চ।
/ইউএমএইচ