মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শুধু সামরিক চাপ নয়, কার্যত সরকার পরিবর্তনের দিকেই এগোতে চাইছেন। কূটনীতি এখানে আর মূল পথ নয়, বরং কূটনীতি যেন সামরিক প্রস্তুতির আড়ালমাত্র। ট্রাম্পের বক্তব্য আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বিষয়টি কোনো হঠাৎ উত্তেজনা নয়। একদিকে ট্রাম্প বলছেন, ‘ইরানে সবচেয়ে ভালো বিষয় হতে পারে সরকার পরিবর্তন।’ আরেকদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী দ্বিতীয় রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ধাপে ধাপে সাজানো একটি কৌশল। একদিকে আলোচনা চালানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী রণতরী, স্টেলথ বোমারু, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জড়ো করা হচ্ছে। অর্থাৎ কথায় শান্তি, কাজে যুদ্ধের প্রস্তুতি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযানের সম্ভাব্য ধরন। আগের মতো সীমিত এক-দুই দিনের হামলা নয়, এবার কথা হচ্ছে কয়েক সপ্তাহব্যাপী টানা আক্রমণের। শুধু পারমাণবিক স্থাপনা নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, নিরাপত্তা সংস্থা, সামরিক ঘাঁটি- সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এটি আসলে শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার কৌশল, যেন দেশটি আর আগের মতো দাঁড়াতে না পারে। ট্রাম্পের ভাষায় ‘ভয় দেখানো দরকার’। এই কথার ভেতরেই তার মানসিকতা স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন, শক্তি প্রদর্শনই সমস্যার সমাধান। তার অতীত রেকর্ডও সেই ধারণাকেই জোরালো করে। যেমন- সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড, পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা, চুক্তি ভেঙে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল। সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি ঝুঁকি নিতে ভয় পান না, বরং ঝুঁকিকেই রাজনৈতিক অস্ত্র বানান।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে। দেশটি একদিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, অন্যদিকে সামরিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কায় আছে। ইরান জানে, তারা এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারবে না। কিন্তু পাল্টা আঘাত দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে। এখানেই যুদ্ধের ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অভিযান শুরু করে, তা হলে ইরান শুধু চুপ করে বসে থাকবে না। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, সৌদি আরব- সব জায়গায় থাকা মার্কিন ঘাঁটি তখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ, এটি আর দুই দেশের যুদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলে বিস্তৃত সংঘাত হয়ে উঠবে।
এই খেলায় আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার অবস্থান একেবারে পরিষ্কার- ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি হতে হলে তা ইসরাইলের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে হতে হবে। বাস্তবে এর মানে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ, আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। ইসরাইল বহু বছর ধরেই চায় ইরানের বর্তমান সরকার টিকে না থাকুক। ট্রাম্প সেই চাওয়াকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছেন, ‘সরকার পরিবর্তনই সবচেয়ে ভালো হতে পারে।’ এই বক্তব্য কোনো কূটনৈতিক বাক্য নয়, এটি সরাসরি শাসন উৎখাতের ইঙ্গিত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা নজিরবিহীন। মধ্যপ্রাচ্যে দুইটি বিমানবাহী রণতরী, ডজনখানেক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, এফ-৩৫ ও বি-২ বোমারু বিমান- সবকিছু একসঙ্গে জড়ো করা হয়েছে। এই ধরনের মোতায়েন সাধারণত তখনই করা হয়, যখন যুদ্ধ প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া হয়। এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো- এই প্রস্তুতি নিজেই যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি প্রস্তুত হয়, ইরান তত বেশি সতর্ক হয়। ইরান যত বেশি সতর্ক হয়, তারা তত বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখে। ফলে ভুল বোঝাবুঝি, দুর্ঘটনা বা একটিমাত্র হামলাই পুরো অঞ্চলকে আগুনে ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্পের কৌশল তাই মূলত তিন ধাপে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম ধাপে রয়েছে কূটনীতির নামে সময় নেওয়া। দ্বিতীয় ধাপে সেই সময়ের মধ্যে পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। আর তৃতীয় ধাপে চাপের মুখে ইরান নতি স্বীকার না করলে দীর্ঘমেয়াদি আক্রমণ শুরু করা। এই আক্রমণের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। লক্ষ্য হলো, রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল করা, জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি বানানো যেখানে ইরানের ভেতর থেকেই সরকার পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, এটি আর ‘নিউক্লিয়ার ইস্যু’ নয়, এটি হয়ে গেছে রেজিম চেঞ্জ প্রকল্প। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের ইরান নীতি কোনো সংকট ব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি হিসেবি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া প্রক্রিয়া। এখানে যুদ্ধ কোনো দুর্ঘটনা নয়- এটি একটি সম্ভাব্য পরিকল্পিত পরিণতি। আর সেই পরিণতির ফল হতে পারে কয়েক সপ্তাহব্যাপী টানা হামলা, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আগুন এবং এমন এক যুদ্ধ যার শেষ কোথায়, কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। এখন পুরো চিত্রটা যদি বিশ্লেষকদের চোখ দিয়ে দেখা হয়, তা হলে বোঝা যায়- এই সংকট শুধু সামরিক নয়, এটি কৌশলগত, মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক তিন স্তরের লড়াই।
প্রথমেই আসা যাক ভালি নাসরের মন্তব্যে। তিনি সরাসরি বলেছেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল যুদ্ধের হুমকি দিয়ে পরে প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়া। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি দেখাল ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে ইরানকেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল যে বড় সংঘাত আসছে। ফলে ইরান এখন আর অপ্রস্তুত নয়, বরং তারা নিজেদের পাল্টা হামলার সক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সাজিয়ে নিচ্ছে। নাসরের ভাষায়, এই সময়টা ইরানের জন্য আত্মরক্ষার নয়, বরং যুদ্ধের প্রস্তুতির সময়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ আসে সাবেক ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান জোসেফ ভোটেলের কাছ থেকে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে বড় আকারের অভিযান চালায়, তা হলে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিখুঁত না হলে তা আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ ইরানের পাল্টা হামলা শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান সব জায়গায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত আসবে। তার বক্তব্যের মূল কথা, ‘প্রশ্ন যুদ্ধ করা যাবে কি না তা নয়, প্রশ্ন হলো, সেই যুদ্ধের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা আছে কি না।’ আরও কড়া ভাষায় কথা বলেন আরেক সাবেক সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান কেনেথ এফ. ম্যাকেঞ্জি জুনিয়র। তার মতে, ইরান ট্রাম্পকে ভয় পায়, কারণ তিনি অতীতে সত্যিই হামলা চালিয়েছেন হুমকি দিয়ে থেমে যাননি। সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড এবং পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একজন নেতা যিনি সিদ্ধান্ত নিলে সরাসরি অ্যাকশনে যান। তাই ইরান এই প্রস্তুতিকে শুধু নাটক হিসেবে দেখছে না, বরং বাস্তব যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে নিচ্ছে।
কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আসে মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পেন্টাগন উপদেষ্টাদের কাছ থেকে, যাদের মতে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান মানেই রেজিম চেঞ্জ। তাদের যুক্তি খুব সরল, যদি শুধু পারমাণবিক কর্মসূচিই লক্ষ্য হতো, তা হলে সীমিত হামলাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সপ্তাহব্যাপী টানা আক্রমণ মানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করা, নিরাপত্তা বাহিনী দুর্বল করা। এসবের শেষ ফল একটাই- সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করা। সবচেয়ে বাস্তববাদী মূল্যায়নটা করেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষকরা, তাদের মতে, এই ধরনের অভিযান কখনোই পরিষ্কার বিজয়ে শেষ হয় না। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো প্রথম ধাক্কায় সামরিকভাবে এগিয়ে থাকবে, কিন্তু সময় যত বাড়বে, খরচ, ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা তত বাড়বে। এক পর্যায়ে যুদ্ধ সামলানোর চেয়ে যুদ্ধ থামানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত বক্তব্য থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট- ট্রাম্পের পরিকল্পনা সামরিকভাবে সম্ভব, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি ইরানের সরকারকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে, যার নিয়ন্ত্রণ আর কোনো পক্ষের হাতেই থাকবে না। সংক্ষেপে বললে, বিশ্লেষকদের চোখে এটি কোনো ‘চাপ সৃষ্টি কৌশল’ নয়। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি যুদ্ধপথ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলানো, কিন্তু যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে একটি নিয়ন্ত্রণহীন আঞ্চলিক বিস্ফোরণ।
সময়ের আলো/এনএ