সরকারি প্রজ্ঞাপন, ছাড়পত্র এবং আনুষ্ঠানিক যোগদান সবই সম্পন্ন। তবুও তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অর্থোপেডিক (হাড়-জোড়া) বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ডা. মোজাম্মেল হক হাসপাতালের ভেতরে উপস্থিত নন। সরকারি চিঠিতেও বিষয়টি স্পষ্ট। এই অনুপস্থিতি শুধু সাধারণ অবহেলা নয়, এটি জনগণের জীবনের সঙ্গে প্রতারণা।
২০২৫ সালের ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে পদায়ন করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান হলেও তিনি হাসপাতালে হাজির হননি। তিনি বেতনও উত্তোলন করছেন না, পদত্যাগও করেননি। ফলে প্রশাসনিকভাবে পদ খালি ঘোষণা করা যায়নি, নতুন ডাক্তার নিয়োগের পথও বন্ধ। এক কথায়, কাগজে পদ পূর্ণ বাস্তবে শূন্য।
এলাকার সাধারণ জনগণ জানান, এখানে শুধুই ডাক্তার একা দায়ী নয়। প্রশাসনও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। পদ খালি ঘোষণা করা হয়নি, নতুন ডাক্তার নিয়োগ হয়নি, এবং হাসপাতালের কার্যক্রম কার্যত অচল। এর ফলে বিনা চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর পথযাত্রী হয়ে পড়ছেন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দুর্ঘটনা, হাড় ভাঙা বা জয়েন্টের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে দূরের বরগুনা সদর বা বরিশাল পর্যন্ত যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসক সংকট প্রকট। অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা কম। গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো কার্যত অচল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা তো দূরের কথা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও দুরূহ। প্রতি মাসে গড়ে ১৫০ রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার মধ্যে অনেকেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।
ডাক্তার সংকট বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন মেডিকেল অফিসার কর্মরত রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী এ হাসপাতালে ১৪ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। তীব্র ডাক্তার সংকট রয়েছে। প্রতিমাসে ইনডোর ও আউটডোর মিলে প্রায় ৯ হাজারের মতো রোগী চিকিৎসা নেন। এত বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে মাত্র তিনজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে সেবা চালানো বাস্তবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা হেলথ রাইটস ফোরামের সভাপতি মো. রাফিউল ইসলাম বলেন, কাগজে পদ পূর্ণ হলেও বাস্তবে ডাক্তার নেই। এটি জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা এবং প্রশাসনের উদাসীনতা। আড়াই লাখ মানুষ জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক রোগী মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত অবিলম্বে পদ খালি ঘোষণা, নতুন ডাক্তার নিয়োগ এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাড় ভাঙা, জয়েন্টের সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি অর্থোপেডিক রোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন না। প্রশাসনিক জটিলতা ও চিকিৎসক অনুপস্থিতির কারণে অনেককে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন, ছাড়পত্র এবং অফিসিয়াল স্বীকারোক্তি থাকা সত্ত্বেও ডাক্তার অনুপস্থিত। প্রশাসন পদ খালি ঘোষণা না করায় নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে না।
এ বিষয় ডা. মোজাম্মেল হক এর বক্তব্য জানতে চাইলে তার মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ভূপেন চন্দ্র মণ্ডল বলেন, আমি যোগদানের আগে থেকেই তিনি অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। তিনিও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/জোআই