মন্ত্রী-এমপিদের শপথগ্রহণ ও ছায়া মন্ত্রিসভা

শাহনেওয়াজ

মতামত

নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি ) আর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ কেন? এই প্রশ্ন অনেকের মনে উঁকি দিতে পারে। কারণ

2026-02-17T04:29:26+00:00
2026-02-17T04:29:26+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
মন্ত্রী-এমপিদের শপথগ্রহণ ও ছায়া মন্ত্রিসভা
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:২৯ এএম 
জাতীয় সংসদ ভবন। সংগৃহীত ছবি
নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি ) আর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ কেন? এই প্রশ্ন অনেকের মনে উঁকি দিতে পারে। কারণ এই শপথগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায় মূলত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও নৈতিক অঙ্গীকার। 

দীর্ঘদিন পর দেশের সুষ্ঠু পরিবেশে একটি অনন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশের মানুষ মন খুলে তাদের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। এই অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের দৃশ্য শুধু দেশের মানুষ দেখেনি। দেখেছে সারা বিশ্ব। যে কারণে বিদেশ থেকে যারা পর্যবেক্ষক এসেছেন তারা সবাই উপলব্ধি করেছেন নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

দেশে এর আগে যে নির্বাচন হয়নি তা নয়। সেই সব নির্বাচন নিয়ে অনেক ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে ভোট দেওয়ার দৃশ্য এখন ভোটারদের চোখেমুখে রয়েছে। নিজের ভোট দিতে গিয়ে দেখে কে যেন আগেই দিয়ে ফেলেছে। আর এক পক্ষ নির্বাচন কারও কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। যে কারণে দীঘদিন পর ভোটাররা খুশি মনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। আগের মতো কোনো ধরনের ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়নি। ভোট গণনা নিয়ে হয়তো কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের আপত্তি থাকতে পারে। বিষয়টি হয়তো নির্বাচন কমিশন খতিয়ে দেখবে।

ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা, সেনাবাহিনী, আনসার বাহিনীসহ সবাই বেশ মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আন্তরিকভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন। সবাই অবশ্য প্রশংসার দাবি রাখেন।
নির্বাচন পর্ব শেষ। এখন সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের পালা। প্রচলিত নিয়মে জয়ী প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশ করার পর তিন দিনের মধ্যে শপথগ্রহণ করা। সেই ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নবনির্বাচিত মন্ত্রীরাও শপথ নেবেন। 

শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে এই শপথ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় করার একটি অন্যতম ও অপরিহার্য ধাপ। বাংলাদেশে শপথগ্রহণের বিধান রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধান অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য শপথগ্রহণ না করে সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে পারেন না।  একই সঙ্গে মন্ত্রীরা শপথ ছাড়া তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। 

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন রক্ষা ও মান্য করার অঙ্গীকার হচ্ছে শপথের আসল কথা। এর মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ঘোষণা করেন যে, তারা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সংবিধান ও আইন অনুয়ায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া মন্ত্রীরা তাদের শপথে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দেন। গোপন করবেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বিষয়গুলো। এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় শপথগ্রহণের পর। 

আবার শপথ একটি নৈতিক অঙ্গীকার। কারণ এটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। যাদের ভোটে নির্বাচিত হন তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে শপথগ্রহণের মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা জনগণের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শপথগ্রহণের পর অনেকে এই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। আশা করি, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভুলবেন না। শপথের মাধ্যমে আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ২৯৭টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২৯৭ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আজ সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এরপর
প্রথমবারের মতো নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ পড়াবেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ ১৩ দেশের সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেক সরকারপ্রধান আসতে পারবেন না। কিন্তু সেসব দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আসছেন। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর যেভাবে চাইবেন সেভাবেই মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নির্ধারণ করবেন। সর্বোচ্চ ১০ ভাগের এক ভাগ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত হতে পারবেন। অর্থাৎ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হতে পারবেন। 

এগারো দলের জোটে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সম্প্রতি বলেছেন, তারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। এখন প্রশ্ন আসে কেন এই ছায়া মন্ত্রিসভা। সরকারের সমান্তরালে ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কী? সংসদীয় গণতন্ত্রে কেবল সরকারই শেষ কথা নয়। সরকারের কাজে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিকল্প পথ দেখানোর জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। এই অপরিহার্যতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ছায়া মন্ত্রিসভা। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এটাকে অনেক সময় বলা হয়, অপেক্ষমাণ সরকার। 

ছায়া মন্ত্রিসভা বাংলাদেশে খুব দেখা যায়নি। বরং শক্তিশালী বিরোধী দল দেখা গেছে। যারা সরকারের ভুল কাজগুলোর সমালোচনা করে তুলোধুনো করে ছেড়েছে। আবার বিরোধিতা করার নামে শুধু বিরোধী বক্তব্য দিয়ে গেছে। তবে ছায়া মন্ত্রিসভা হচ্ছে, প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত এমন এক দল, যা সরাসরি সরকারের আদলে তৈরি করা হয়। সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন সদস্যকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সরকারের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একজন ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়। 

ছায়া মন্ত্রিসভার মূলত কাজ কী হবে। চারটি প্রধান লক্ষ্য নিয়ে এই ছায়া মন্ত্রিসভা কাজ করে। বিশ্বের অনেক দেশেই ছায়া মন্ত্রিসভা একটি আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যুক্তরাজ্য হচ্ছে ছায়া মন্ত্রিসভার জন্মভূমি। বর্তমানে কনজারভেটিভ পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ছায়া মন্ত্রিসভা পরিচালনা করছে। কানাডায় অফিসিয়াল অপজিশন ক্রিটিক বলা হয়। তারা সরাসরি সরকারের ব্যয়ের ওপর নজরদারি করে। অস্ট্রেলিয়ায় ছায়া মন্ত্রিসভা সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। এমনকি বিকল্প বাজেট পেশ করা হয়। 

নিউজিল্যান্ডে সংসদীয় ব্যবস্থায় এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকাসহ আরও কয়েকটি দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ছায়া মন্ত্রিসভার কোনো সাংবিধানিক কাঠামো নেই। এর আগে কখনো এ নিয়ে চর্চা হয়নি। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আগ্রহ দেখিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি সবল গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা যেমন জরুরি, তেমনি সেই বিরোধী দলের সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। যা সরকারকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেয়। জনগণের সামনে একটি বিকল্প আস্থার জায়গা তৈরি করে। 

রাজনৈতিক সরকারের কাছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে। এই চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে বিরোধী দল একাত্মতা প্রকাশ করে। তা হলে জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, পেশাজীবীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে অহেতুক আন্দোলন করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে  এমন কিছু বিষয় থাকতে পারে যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। জনগণের জানমালের বিষয়টি বিবেচনায় এনে রাস্তা অবরোধ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন দেশে দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তার এক পাশে মানববন্ধন করে থাকে। 

আমাদের দেশে যে করা হয় না তা নয়। কিন্তু দিনের শেষে তা অনেক ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ কোনো বার্তা বয়ে আনে না। এই পেশাজীবী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের দাবি নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, সত্যিকার অর্থে যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করলে নিশ্চয়ই সরকারের কানে পৌঁছাবে। এতে ছায়া মন্ত্রিসভা জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা পাবে।পাশাপাশি সরকারের দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যাবে। আর সরকারের গ্রহণযোগ্যতা আপামর মানুষের কাছে বৃদ্ধি পাবে। দেশে এভাবে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করবে। 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: