পবিত্র রমজান মাসের আগমন হয় রহমত ও বরকতের সুসংবাদ নিয়ে। এ মাসে মুমিন বান্দারা সংযম, সবুর ও সহনশীলতার উত্তম অনুশীলন করে থাকে। মহান আল্লাহর হুকুম পালনার্থে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকে। তাই মহান আল্লাহও এ মাসে অঝোর ধারায় রহমত ও বরকত বর্ষণ করেন মুমিনদের প্রতি। আল্লাহর দান ও প্রতিদান লাভের জন্য এই মাসের চেয়ে মোক্ষম সময় ও অবারিত সুযোগ বান্দা কোনো মাসে অর্জন করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার কসম! মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমজান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি।
কেননা মুমিনগণ এ মাসে (পুরো বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনিমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৮৩৬৮)
এটি এমন মাস, যে মাসে মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মাহে রমজান, যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে। যা মানুষের জন্য হেদায়েত। হেদায়েতের স্পষ্ট নিদর্শন এবং হক-বাতিলের পার্থক্যকারী’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। এ মাসেই হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ওপর সহিফা অবতীর্ণ হয়েছে। হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত নাজিল হয়েছে। হজরত দাউদ (আ.)-এর ওপর জাবুর নাজিল হয়েছে এবং হজরত ঈসা (আ.)-এর ওপর ইনজিল অবতীর্ণ হয়েছে। (তাফসিরে তাবারি : ২৪/৩৭৭)
হাদিসে এ মাসকে বরকতময় মাস বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের কাছে রমজান এসেছে, বরকতময় মাস। এ মাসে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন’ (নাসায়ি : ২০৮৯; মিরকাত : ৪/১৩৬৫)। আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসের বরকতে জান্নাতের দুয়ার খুলে দেন। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখেন। দুষ্ট জিনদের আটকে রাখেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজানের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার কোনো দরজা খোলা হয় না। আর জান্নাতের গেটগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কোনোটি বন্ধ করা হয় না এবং একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে, হে কল্যাণ কামনাকারী! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণ প্রত্যাশী! (গুনাহের ইচ্ছাকারী) ক্ষান্ত হও। আর প্রতি রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অনেক জাহান্নামিকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দান করেন।’ (তিরমিজি : ৬১৭; মুসতাদরাকে হাকিম : ১৫৩২)
আরও পড়ুন
এ মাস এমন বরকতময়, যার পুরো মাসেই রয়েছে বরকতের নানাদিক। হাদিসে এসেছে, এ মাসের প্রথম দশ দিন রহমতের। মাঝের দশ দিন মাগফিরাতের। শেষের দশ দিন নাজাতের এবং রমজানের প্রথম দিনে আল্লাহ তায়ালা ইবাদতকে নিরবচ্ছিন্ন রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করে নেন। অর্থাৎ রমজানের প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ রহমত ও বরকত দান করেন (ইবনে খুজায়মা : ১৮৮৭)। রোজার বরকতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রোজাদারের দোয়া ফেরত দেন না। হাদিসে এসেছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেওয়া হয় নাÑ ১. রোজাদার যখন ইফতার করে। ২. ন্যায়বিচারক বাদশা। ৩. মজলুমের দোয়া’ (তিরমিজি : ২৫২৫)। রমজানের আরেকটি বরকত হলো, এ মাসে ওমরাহ আদায় করলে হজের সমান হয় (বুখারি : ১৭৮২; মুসলিম : ১২৫৬)। ফেরেশতারাও রোজাদারের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকে (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৭৮৫)। রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ রোজাদারকে মাফ করে দেন। রমজান মাসে আমলের প্রতিদান আল্লাহ বেহিসাব বৃদ্ধি করে দেন। হাদিসে এসেছে, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে রোজা ব্যতীত। কারণ রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব। সে আমার জন্য পানাহার ও স্ত্রী সহবাস পরিহার করেছে।’ (মুসলিম : ১১৫১)
এ মাসের বরকত পেতে চাইলে বেশি বেশি নেক আমল করার পাশাপাশি অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে। হাদিসে আছে, অপচয়কারী শয়তানের বন্ধু। রমজানে অনেককে দেখা যায়, ইফতার ও সেহরিতে প্রচুর খাবারের আয়োজন করে থাকে। কিন্তু সে পরিমাণ খাওয়া হয়ে ওঠে না তাদের। এতে অপচয় হয় ব্যাপক। অথচ এমন মানুষও আছে যারা অভাবের তাড়নায় ইফতার ও সেহরিতে ভালো কিছু খেতে পারে না। সমাজের বিত্তবানরা যদি এই রমজানে গরিবের জন্য সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেয়, তা হলে জীবনে আরও বরকত হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সবাইকে মাহে রমজানের বরকত অর্জনের এবং জীবনভর তা ধারণ করার তওফিক দান করুন।
এএডি/