চকবাজারের ইফতার পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শতাব্দী পেরিয়েও যার আবেদন অমলিন। দ্রব্যমূল্যের চাপ, সময়ের পরিবর্তন কিংবা আধুনিকতার দাপট কোনো কিছুই ম্লান করতে পারেনি এই বাজারের কদর। তাই বলা যায়, রমজান এলেই পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র চকবাজার আবারও রূপ নেয় ইফতারের রাজ্যে যেখানে ঐতিহ্য, স্বাদ আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য আবহ।
রোজার প্রথম দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন দুপুর থেকেই চকবাজার সার্কুলার রোডজুড়ে দেখা যায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। বিশেষ করে আসরের নামাজের পরে পুরো এলাকা যেন লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পদের ইফতারি সাজিয়ে বসেন দোকানিরা, আর দূর থেকেই ভেসে আসে কাবাব, হালিম ও মসলার ঘ্রাণ। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিক্রেতাদের মুখে শোনা যায় ঐতিহ্যবাহী হাঁকডাক ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’। এই ডাক যেন বাজারের নিজস্ব সুর, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।
তবে দাম আগের মতো হলেও কয়েকটি পদের ইফতারির দাম কিছুটা বাড়তি বলে অভিযোগ আছে ক্রেতাদের। আর যেগুলোর দাম বাড়েনি, আগের দামেই রয়েছে— সেগুলোর আকারে ছোট করা হয়েছে। বিষয়টি বিক্রেতারাও তা অস্বীকার করছেন না। তাদের যুক্তি হলো— আটা, চিনি, তেল, ডালসহ ইফতারসামগ্রী বানাতে যেসব উপাদান প্রয়োজন হয়, সেসবের দাম বাড়ায় এ বছর বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ইফতার।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, রোজার প্রথম দিনেই ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে জমে উঠেছে ইফতারসামগ্রীর বাজার। বিকাল গড়াতেই শাহী মসজিদের সামনের গলিগুলো ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই ইফতার বাজারে পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই এখানে ইফতার কিনতে এসেছেন। দুপুর গড়াতেই বাড়তে থাকে ক্রেতাদের ভিড়। দোকানিরা রাস্তার দুইপাশে নানা পদের ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
মানভেদে দামও ভিন্ন। কেউ কাবাবের শিকে মাংস গেঁথে আগুনে দিচ্ছেন, কেউ বড় ট্রেতে সাজাচ্ছেন সোনালি জিলাপি, আবার কেউ কাচের জারে ঢালছেন কাশ্মিরি ও ইরানি শরবত। কড়াইভর্তি তেল, ধোঁয়া ওঠা কাবাব, রঙিন শরবত আর মসলার গন্ধে বাতাস মাতোয়ারা। এর মধ্যে গ্রিল ও রোস্ট আইটেমে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। রোল, নান ও পরোটার মধ্যেও রয়েছে নানা আয়োজন। দূর থেকেই নাকে ভেসে আসে কাবাব ও মসলার ঘ্রাণ। আবার ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিক্রেতাদের ঐতিহ্যবাহী হাঁকডাকও বাজারের বিশেষ আকর্ষণ।
দাম কিছুটা চড়া হলেও প্রথম দিনেই ঐতিহ্যবাহী এই ইফতার বাজারে বেচাকেনা ছিল জমজমাট। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ে আস্ত খাসির কাবাব, যার দাম ১০ হাজার টাকা।
বিক্রেতা মো. সালেহ সময়ের আলোকে বলেন, কেনাবেচা খুব বেশি নেই। তবে সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসছেন ভিড় করছেন এবং ছবি তুলছেন। এ ছাড়া নানা আইটেমের শাহী পরোটা, নান রুটির দোকানগুলোতে ছিল বাড়তি আয়োজন। গরুর কালা ভুনা, চিকেন তাওয়াসহ ইফতারসামগ্রীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মুরগির রোস্ট, আস্ত মুরগির কাবাব, মুরগির গ্রিল, মোরগ মুসাল্লম, খাসির লেগ, কোয়েল পাখির রোস্ট, টিকা কাবাব, বঁটি কাবাব, চিকেন কাঠি, চিকেন ললিপপ, কোফতা, শিক কাবাব, সুতি কাবাব, কবুতরের রোস্ট, হালিম, সমুচা, নিমকপারা, দইবড়া, বিভিন্ন ধরনের শাহী জিলাপি ও হালুয়া, লাবাং, কাশ্মিরি ও ইরানি শরবতসহ নাম না জানা অসংখ্য পদ।
রাজধানীর বংশাল এলাকা থেকে ইফতারি কিনতে এসেছেন মশিউর রহমান। তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমল থাইকা প্রতি বছর রোজায় আমরা এই চকবাজার থেকে ইফতারি কিনি। এবারও এসেছি। এখানকার মজাদার ইফতার নিয়ে গেলে পরিবার ও বাচ্চারা খুব খুশি হয়। তবে এবারে সব আইটেমের দামই একটু বেশি। দামাদামি করেও লাভ হলো না।
আরমানিটোলার বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, রোজার মধ্যে চকবাজারে আসা একটা উৎসবের মতো। তবে বিভিন্ন পদের দামের মধ্যে মুরগি, কোয়েল পাখির রোস্ট এসব আইটেমে দাম কিছুটা বাড়তি চাচ্ছে। আবার শিঙাড়া-সমুচা-নিমকিসহ অনেক আইটমের দাম আগের মতো থাকলেও সাইজে ছোট করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এই ইফতারি বাজারের ইতিহাসও কয়েকশ বছরের পুরোনো। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান এখানে নির্মাণ করেন শাহী মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে একটি আধুনিক বাজারে রূপ দেন। সেই সময় থেকেই রমজান মাসে মসজিদকে ঘিরে বসতে শুরু করে মুখরোচক ইফতারির ভাসমান বাজার। শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে।
এই বাজারের ৩৮ বছরের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে আব্দুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমার বাপ-দাদা এখানে ব্যবসা করছে। আমাদের বংশ পরম্পরায় চলছে এই ব্যবসা। এখানে কেউ ঐতিহ্যের টানে, আবার কারও কাছে বাহারি স্বাদের কারণে এখান থেকে ইফতারি কেনে। তবে রোজার প্রথম দিনে কেনাবেচা একটু কম। হয়তো প্রথম রোজা তাই পরিবারের বানানো আইটেম দিয়েই অনেকেই ইফতারি সারেন, তার কারণে কিছুটা ভিড় কম।
দরদাম : চকবাজারের অন্যতম আকর্ষণ ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’। খায় মূলত মাংস, কাবাব, ডিম, ঘি, বুটের ডাল, মাংসের কিমা ও নানা ধরনের মসল্লা দিয়ে তৈরি করা হয়। বৈচিত্র্যময় স্বাদের জন্য রোজাদারদের আগ্রহের লিস্টে থাকে এ খাবার। গত বছরের মতো এবারেও প্রতি কেজি ৮০০ টাকাতে বিক্রি হচ্ছে।
ইফতারসামগ্রীর মধ্যে ভারী আইটেমের মধ্যে খাসির লেগ প্রতি পিস ৮০০ টাকা। গরুর সুতি কাবাব কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ও খাসির সুতি কাবাব কেজি ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর কালা ভুনা প্রতি প্যাকেট ১৫০ এবং চিকেন তাওয়া প্যাকেট ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। মুরগির লেগ ১৫০, রোস্ট ৩২০, আস্ত লেগ রোস্ট ৮০০, চিকেন গ্রিল ফুল ৪৮০, চিকেন আলফাহাম ৫২০, কোয়েল রোস্ট ১২০, কোয়েল পাখি পিস ৯০, কবুতর রোস্ট ৩০০, আস্ত চিকেন রোস্ট ৪২০ এবং খাসির লেগ পিস ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিকেন আচারি ১২০, শাহী রুটি ৮০-১০০ ও চিকেন ললিপপ প্রতি পিচ ৫০ টাকা। দইবড়া ৫ পিস ২০, চিকেন সাসলিক ৮০, চিকেন স্টেক ৮০, চিকেন লেগ পিস ৮০, তান্দুরি চিকেন ১০০, চিকেন বল ৬০, চিকেন বান ৪০, শর্মা ৪০, চিকেন টোস্ট ৬০, ডিম চপ ২০, শাহী পরোটা ৬০-৮০, টিকা ১০-৩০, জালি কাবাব ৩০, চিকেন কাটলেট ৩০, বোনলেস চিকেন ফ্রাই ৩০, সমুচা ২০, নিমকি ২০, শাহী পরোটা মুরগির কিমা দিয়ে ৬০, গরুর পরোটা ৮০, মিষ্টি পরোটা ৪০, মালপোয়া পিঠা পিস ২৫, কলিজা দিয়ে শিঙাড়া প্রতি পিস ১৫, কিমা সমুচা ১৫, চিকেন সাসলিক ৩৫, চিকেন অনথন প্রতি পিস ২০, ভেজিটেবল রোল ২৫, চিকেন কাকোজ ৪০ এবং শাহী জিলাপি কেজি ৩০০, রেশমি জিলাপি কেজি ৫০০ এবং সাধারণ জিলাপি ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ছোলা, মুড়ি, আলুর চপ, বেগুনি, পিঁয়াজু, ঘুঘনি পাওয়া যায়, যা বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যেই। দুধ নান ৬০, গার্লিক নান ৭০ এবং স্পেশাল বাদাম নান ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টান্নেও কমতি নেই। দই-চিড়া প্রতি বাটি ১০০, ফালুদা ছোট বাটি ১২০ এবং বড় বাটি ৫০০ টাকা। পানীয়ের মধ্যে বোরহানি প্রতি লিটার ২০০, হাফ লিটার ১০০ এবং ঐতিহ্যবাহী লাবাং প্রতি লিটার ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
এফআর