বইমেলা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু এবার বিতর্কটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। রমজানের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা করার সিদ্ধান্তে কয়েকশ প্রকাশক এতটাই শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন যে তারা সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দরজায় কড়া নাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট যখন নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন কয়েকশ প্রকাশক। প্রশ্ন একটাই, ঈদের মুখে বইমেলা হলে আসলে কার লাভ, কার ক্ষতি?
কারণ অন্তর্বর্তী সরকার তাদের টাইম ফ্রেম বেঁধে দিয়েছে বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে হতে হবে। অথচ ওই চিঠিতে প্রায় ৩০০ প্রকাশক লিখেছেন, রোজার মধ্যে এভাবে বইমেলা হওয়া মানে তাদের ব্যবসায়িক আত্মহত্যার শামিল। প্রকাশকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে মেলা হলে তাদের খরচ উঠে আসবে না— এ ভয়টাই তাদের আপত্তির মূল কারণ। বাংলাদেশে পাঠকের অভ্যাস নিয়ে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের জরিপে ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বই পড়ার অভ্যাসে ৯৭তম স্থানে রয়েছে। প্রকাশিত বইয়ের ৯৫ শতাংশের প্রথম ছাপা ৩০০ কপি বা তার চেয়ে কম এবং ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় না। গত দেড় বছরে বই বিক্রি কমেছে ৬০ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায় প্রকাশকদের অবস্থা কতটা খারাপ।
ফেব্রুয়ারিতে রমজান আর ঈদের প্রস্তুতি থাকায় মানুষের খরচ জামাকাপড় আর খাওয়া-দাওয়ায় চলে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা, যারা মূল ক্রেতা, ঢাকায় থাকেন না। ফলে মেলা পাঠকশূন্য হয়ে যায়, যা প্রকাশকদের জন্য নিশ্চিত ক্ষতি।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো লজিস্টিক আর মানবিক সমস্যা। নির্বাচনের সময় ছাপাখানা আর বাঁধাইয়ের শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা তাড়াহুড়ো করে মেলা আয়োজনকে অবাস্তব করে তোলে। স্টলের বেশিরভাগ কর্মী শিক্ষার্থী, যারা ঈদের আগে বাড়ি যেতে চান। তাদের আটকে রাখা অমানবিক, আর রোজা রেখে সারা দিন কাজ করে ইফতারের পর ক্লান্ত শরীরে স্টলে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি আর মানবিক অধিকারের বিপরীত।
প্রকাশকদের দাবি শুধু সময়সূচি বদলানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্টল আর প্যাভিলিয়ন ভাড়া মাফ করা, সরকারি খরচে অবকাঠামো তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বই-ভাতা বা প্রণোদনা চালু করা। প্রতিটি মানসম্পন্ন বইয়ের অন্তত ৩০০ কপি সরকারিভাবে কেনার দাবিও রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্র লাইব্রেরি আর পাঠকদের জন্য হাজার হাজার কপি বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের নিরাপত্তা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রকাশনা খাত থেকে মোট দেশীয় আয়ের প্রায় ০.৫ শতাংশ আসে এবং এই খাতেই কর্মসংস্থান হয়েছে সাড়ে সাত লাখ মানুষের।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশে প্রকাশকরা ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায় বই প্রকাশ করে যান। সরকারি প্রণোদনা না থাকলে এই শিল্প টিকবে না। এই দাবিগুলোর যুক্তি বোঝার জন্য একটা বই বাজারে আনতে কত খরচ হয়, সেটি আগে বুঝতে হবে। একটি বই লেখা থেকে শুরু করে কম্পোজ, প্রুফ, প্রচ্ছদ, ছাপা, বাঁধাই আর বিপণন, প্রতিটি ধাপেই খরচ আছে। বইমেলায় স্টল সাজানোর খরচ মোটেও কম নয়।
উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একটা মাঝারি স্টল ভাড়া নিতে ৮৪ হাজার, সাজাতে তিন লাখ, চালাতে আরও তিন লাখ, মোট ছয় লাখের কাছাকাছি খরচ। ছোট প্রকাশকদের জন্য এই টাকা তোলা প্রায় অসম্ভব। বইমেলাকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার বই ছাপা হয়। বাংলা একাডেমির হিসাবে গত বছর ৪৭ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছরের ৫২ কোটির চেয়ে কম।
মেট্রোরেলের কারণে এবার দর্শক বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, কিন্তু ফেব্রুয়ারির সময়সূচি এই সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছে। প্রকাশনা শিল্পের সংকট বিশ্বব্যাপী, কিন্তু বাংলাদেশে এর গভীরতা আরও বেশি।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বই পড়ার হার কমছে, কিন্তু ভারতে সাপ্তাহিক গড় ১০ ঘণ্টা ৪২ মিনিট। বাংলাদেশে এই হার অনেক কম। সবশেষ মেলায় অনেক প্রকাশক তাদের বিনিয়োগ তুলতে পারেননি। অথচ বইমেলার পুরো আয়োজনের আর্থিক ঝুঁকি প্রকাশকরাই বহন করেন। প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত লেখক আর পাঠকরাই ক্ষতির মুখে পড়বেন।
প্রকাশকদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সরকারি বই ক্রয়ের নীতিতে পরিবর্তন আনা। মানসম্মত বই কিনে রাষ্ট্র পাশে দাঁড়ালে প্রকাশকদের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে এবং তারা আরও সাহস নিয়ে বই প্রকাশ করতে পারবেন। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সহায়তা প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আমাদের দেশেও শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মচারীদের বই কেনায় উৎসাহ দেওয়া হলে পাঠকের পরিধি বাড়বে।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ বই খুব সীমিত সংখ্যায় ছাপা হয়, যা প্রকাশকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে।
ঈদের পর মেলা আয়োজন করা গেলে মানুষের খরচের চাপ কিছুটা কমে এবং বই কেনার আগ্রহ বাড়ে। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, ফেব্রুয়ারির সময়সূচি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, এটি বদলালে ঐতিহ্য নষ্ট হবে। কিন্তু প্রকাশকরা বলছেন, মেলা চাই তবে ধ্বংসের পথে যেতে চাই না। বাংলাদেশে বইয়ের বাজার ছোট, আর পাঠকের অভ্যাসও কম।
ইউনেস্কোর রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঠকের হার কমার কারণ অর্থনৈতিক চাপ। ফেব্রুয়ারিতে রমজান আর ঈদের কারণে এই চাপ বাড়ে। স্টল কর্মীদের মানবিক দিক চিন্তা করলে ঈদের পরে মেলা যুক্তিসংগত। এখানে সরকারের সিদ্ধান্তই এখন মূল বিষয়।
বাপুসের সাবেক সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটনের মতো প্রকাশকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রকাশনা খাত ৬৪ হাজার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৬টি দেশে কাজ করে। বাংলাদেশে প্রকাশনা মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু এর দেহে সঠিক পুষ্টি প্রদান করা হয় না। বিভাগীয় এবং জেলা শহরে বইমেলার আগ্রহ ছড়িয়ে দিলে তরুণদের বইমুখী করা যাবে। তরুণদের বইমুখী করতে পারলে সমাজের জন্য ভালো হবে। ছোট প্রকাশকরা এই সুযোগ পেলে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। প্রকাশকদের দাবি মানলে অর্থনীতির চাকা গতিশীল হবে।
বইমেলা ঘিরে স্টল সাজানোর খরচ থেকে শুরু করে প্রিন্টিং প্রেসের শ্রমিকদের রুটি-রুজি নির্ভর করে এই মেলায়। একটি স্টল সাজাতে ৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়, যা কাঠমিস্ত্রির মতো শ্রমিকদের আয় বাড়ায়। বইমেলায় রুটি-রুজি হাজারো শ্রমজীবীর। কাঁটাবন মসজিদ মার্কেটের প্রিন্টিং প্রেস মালিকরা বলছেন, মেলা উপলক্ষে কাজ বেড়ে যায়। প্রতি কপি বাঁধাই ২০-৩০ টাকা এবং ৩০-৪০ হাজার কপি অর্ডার থাকে। এই আয় শ্রমিকদের পরিবার চালায়।
ঈদের পর মেলা হলে এই চাকা আরও সহজে ঘুরবে। বইমেলাকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে এবং একুশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এমন একটা পথ বের করা সম্ভব যেখানে সবার স্বার্থ রক্ষা পায়।
যেহেতু এই মেলার প্রাণ একুশকে ঘিরেই, তাই একুশেই হয়ে উঠুক সত্যিকারের প্রাণের মেলা। এর আগে বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে মেলা সরানোর সময় তুমুল বিতর্ক উঠেছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সময়ের প্রয়োজনে সেই পরিবর্তন সবার জন্যই মঙ্গলজনক হয়েছে। তাই মেলার সময় নিয়ে, বিশেষ করে জাতীয় কোনো সংকট বা রমজানের সঙ্গে সংঘাত হলে, সব পক্ষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা জরুরি।
আমার ব্যক্তিগত মতামত, ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহিদদের স্মরণে একটি সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রতীকী বইমেলা রাখা যেতে পারে, যেখানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে কিন্তু ব্যাপক বিক্রয় কার্যক্রম থাকবে না। নির্বাচন বা দুর্যোগের মতো বিশেষ অবস্থায় এই প্রতীকী আয়োজনটুকু রেখে পরে সবাই মিলে বসে আসল মেলার সময় ঠিক করা যায়। ৩২১টি প্রকাশনা সংস্থা পাঠকশূন্যতা, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা বলে ফেব্রুয়ারির বইমেলা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটি ছিল সময়ের বাস্তবতার সরাসরি স্বীকারোক্তি।
তবু সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ মওকুফের কথা বললেও প্রকাশকদের আশঙ্কা কাটেনি। তাদের ভাষায়, ভাড়া পুরোপুরি মওকুফ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজি উঠে আসবে না। মেলা তো হয় লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের নিয়েই, তা হলে তাদের মতামত না নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তি কোথায়? মেলার দৈর্ঘ্য নিয়েও একাডেমি ভাবতে পারে। কলকাতার বইমেলা কিংবা বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টেরটাও এতদিন স্থায়ী হয় না।
অন্যদিকে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা এই শিল্পকে আরও সংকটে ফেলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পণ্যের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্ত পাঠকের পকেট প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। কাগজের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি বইয়ের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে পাঠকরা আগের মতো ব্যাগভর্তি বই না কিনে মাত্র দুই-তিনটি বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছেন।
মেলা আমাদের ঐতিহ্য, তবে লোকসান দিয়ে ঐতিহ্য টেকে না। সব পক্ষের আলোচনায় সময় নির্ধারণই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক পথ।
গতকাল নতুন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর কাছে প্রকাশকদের আলোচনার পর বইমেলার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা গেছে বটে, কিন্তু এ ব্যাপারে একটা স্থায়ী সিদ্ধান্ত হওয়া অতীব জরুরি। বইমেলার সময়সূচি নিয়ে কাটাছেঁড়া করা দেশের সংস্কৃতির জন্য মঙ্গল নয়।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
এফআর