সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খালের পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পৌরবাসী। পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও পড়েছেন তারা।
শহরের সুলতানপুর বড় বাজারের মাছ বাজার ও কসাইখানার বর্জ্যরে পাশাপাশি খাল পাশে বসবাসকারী লোকজন তাদের বাড়ির ময়লা-আবর্জনা প্রাণসায়ের খালে ফেলায় বদ্ধ খালের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ফলে প্রাতভ্রমণে বের হওয়া পৌরবাসীসহ পথচারীদের খালপাড়ের সড়ক দিয়ে হাঁটার সময় নাকে কাপড় দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। খালের পচা পানির দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাতঃভ্রমণকারী প্রফেসর আবুল কাসেম বলেন, প্রতিদিন খালপাড়ের এ সড়ক দিয়ে কয়েকশ মানুষ হাঁটাহাঁটি করেন এবং গাড়ি করে তাদের গন্তব্যে যান। কিন্তু পানি পচে দুর্গন্ধ হয়ে যাওয়ায় খালপাড়ের রাস্তায় তাদের নাক চেপে ধরে চলাচল করতে হয়। খালের আশপাশের বাসিন্দা ছাড়াও বড় বাজারের ব্যবসায়ী ও অন্য ব্যবসায়ীরা ময়লা ও আবর্জনা ফেলে দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। এতে সাতক্ষীরা শহরের পরিবেশ অনেক দূষিত হয়ে পড়ছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে ১৮৬৫ সালে জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী শহরের পানি নিষ্কাশন এবং নৌ-চলাচলের জন্য এল্লারচর নামক স্থান থেকে এই খাল খনন শুরু করেন। খালটি সাতক্ষীরা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মরিচ্চাপ নদীতে গিয়ে মিশেছে। এটি নৌখালি খালকেও সংযুক্ত করেছে। খালটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিলোমিটার ও প্রস্থ প্রায় ২০০ মিটার। পরবর্তী সময়ে জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর নামেই খালটির নামকরণ করা হয় প্রাণসায়ের খাল। খালটি শহরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বহু বছর ধরে খালটি দখল ও দূষণের শিকার হয়ে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর খালটি খনন করা হয়। ৯২ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় ১০ কিলোমিটার খাল সংস্কারে নামমাত্র খনন করে প্রকল্পের সিংহভাগ টাকাই লোপাট করার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিভাগ-১-এর অধীনে ৬৪টি জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের (১ম পর্যায়) আওতায় প্রাণসায়ের খাল খনন করা হয়। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে খাল খননের কাজ শেষ করা হয়।
পরবর্তীতে শহরের অদূরে এল্লারচর এলাকায় মরিচ্চাপ নদীর সঙ্গে সংযোগস্থল অবমুক্ত করে দিলে প্রাণসায়ের খালে পানির প্রবাহ ফিরে আসে। সেই থেকে নিয়মিত প্রাণসায়ের খালে জোয়ার-ভাটা খেলতে থাকে। শহরের পাকাপুল থেকে গার্লস স্কুল মোড় পর্যন্ত সাড়ে ৩০০ মিটার খাল পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করায় খালের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে থেকে প্রাণসায়ের খালের পানিপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ময়লা আবর্জনা পচে খালের পানি কালো হয়ে চারিদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আশেক ই-ইলাহী বলেন, খালের এই দূষণ শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও চরম হুমকি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আশেক ই-ইলাহী আরও বলেন, বর্জ্য পচে সৃষ্টি হওয়া তীব্র দুর্গন্ধ এবং মশা-মাছির উপদ্রবে আশপাশের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানা রোগ।
এ প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও খালে ময়লা ফেলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, শুষ্ক মৌসুমের কারণে হয়তো এখন প্রাণসায়ের খালে জোয়ার-ভাটা হচ্ছে না। বর্ষা মৌসুম এলেই আবার পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, এরপরও আমি খোঁজ নিয়ে দেখব ঠিক কী কারণে প্রাণসায়ের খালের পানিপ্রবাহ বন্ধ রয়েছে।
এফআর