রমজানে হৃদরোগীদের ঝুঁকি ও করণীয়

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মতামত

পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জীবনে আত্মসংযম, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের এক অনন্য সময়। রোজা শুধু খাদ্য ও পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ

2026-02-24T02:11:58+00:00
2026-02-24T02:11:58+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
রমজানে হৃদরোগীদের ঝুঁকি ও করণীয়
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:১১ এএম   (ভিজিট : ১৯৩)
ফাইল ছবি
পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জীবনে আত্মসংযম, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের এক অনন্য সময়। রোজা শুধু খাদ্য ও পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং এটি মানুষের জীবনধারা, শৃঙ্খলা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলে। তবে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রোজা রাখা একটি সংবেদনশীল বিষয়। হৃদরোগ দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল হওয়ায় রোজার সময় খাদ্যাভ্যাস, পানিশূন্যতা, ওষুধের সময়সূচি, ঘুমের রুটিন ও মানসিক চাপ সবকিছুতে সামান্য অসতর্কতাও গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ স্থিতিশীল হৃদরোগী নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত কারণে রোজা না রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই রোজা রাখা বা না রাখার সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী।

রমজানে হৃদরোগীদের ঝুঁকি
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে ও পান না করার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। এতে রক্ত ঘন হয়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে রক্তচাপের ওঠানামা, হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া, বুক ধড়ফড় বা বুকব্যথার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যারা পূর্বে হার্টের সমস্যায় ভুগেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

ইফতারে হঠাৎ বেশি খাবার গ্রহণও গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। দীর্ঘক্ষণ অনাহারের পর একসঙ্গে ভারী খাবার খেলে হজমে সমস্যা হয় এবং হার্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তেল, লবণ ও ভাজাপোড়া খাবার অতিরিক্ত গ্রহণ হৃদরোগীদের জন্য বিপজ্জনক।
ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তনও হৃদরোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সেহরি ও তারাবিহর কারণে ঘুম কমে গেলে ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং 
উদ্বেগ বাড়ে। দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

রমজানে হৃদরোগীদের চ্যালেঞ্জ
রমজান মাসে হৃদরোগীরা কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। প্রথম হলো পানিশূন্যতা, বিশেষ করে গরমকালে। পানি কম থাকলে রক্ত ঘন হয়ে রক্তচাপ ওঠানামা করতে পারে এবং হার্টের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে। দ্বিতীয়ত ইফতার ও  সেহরিতে অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ভাজা, প্রক্রিয়াজাত খাবার বা সসযুক্ত খাবার রোজায় বেশি খাওয়া হার্টের জন্য ক্ষতিকর। তৃতীয়ত ওষুধের সময়সূচি ঠিকভাবে মেনে চলা কঠিন হয়ে যায়। সেহরি মিস হলে গুরুত্বপূর্ণ হার্টের ওষুধ সময়মতো গ্রহণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। চতুর্থত ইবাদত, কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। অনেক সময় ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে ওজনও বাড়ে, যা হার্টের ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেতন পরিকল্পনা জরুরি।

কারা রোজা রাখলে সতর্ক হবেন
সব হৃদরোগীর জন্য রোজা সমান নিরাপদ নয়। বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন যাদের, হার্ট ফেইলিউর রয়েছে, বিশ্রামেও শ্বাসকষ্ট হয় বা পা ফুলে থাকে,  হৃৎপিণ্ডের পাম্পিং ক্ষমতা ৩০ শতাংশ এর নিচে । সম্প্রতি বড় হার্ট অ্যাটাক বা স্টেন্ট বসানো হয়েছে ।
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ রয়েছে। এই রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখলে ঝুঁকি বেশি। ইসলাম অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছে, তাই নিজের শরীরের সংকেতকে সর্বদা সম্মান করা উচিত।

নিরাপদ রোজার জন্য করণীয়
মেডিকেশন প্ল্যান : রোজা শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করুন কোন ওষুধ ইফতারে এবং কোনটি সেহরিতে খাবেন।
হালকা ইফতার : প্রথমে পানি ও খেজুর গ্রহণ করুন। ১০-১৫ মিনিট বিরতির পর হালকা খাবার খান। একসঙ্গে বেশি খাবেন না।
লবণ ও চর্বি নিয়ন্ত্রণ : রান্নায় লবণ কমিয়ে দিন, প্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।

ফল ও শাকসবজি : প্রতিদিন অন্তত কিছুটা ফলমূল ও শাকসবজি রাখুন। এগুলো হার্টের জন্য উপকারী এবং হজমে সহায়তা করে।
চা-কফি সীমিত : অতিরিক্ত চা বা কফি পানিশূন্যতা বাড়ায়।
পর্যাপ্ত ঘুম : দিনে ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ : রাগ, উদ্বেগ ও মানসিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখুন, প্রয়োজনে বিশ্রাম নিন।
হঠাৎ উপসর্গে ব্যবস্থা : বুকব্যথা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে রোজা ভেঙে দ্রুত প্রয়োজনীয় ওষুধ নিন।

ব্যায়াম ও ইবাদতের ভারসাম্য
রোজায় অতিরিক্ত ব্যায়াম দরকার নেই। নিয়মিত তারাবিহর নামাজ হালকা ব্যায়ামের কাজ করে, রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়। তবে দুর্বলতা বা অসুস্থতা অনুভূত হলে বিশ্রাম নিন।

স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা
জিহ্বার নিচে ব্যবহৃত হার্টের স্প্রে সাধারণত রোজা ভঙ্গ করে না।
প্রয়োজনীয় ইনহেলার, ইনসুলিন বা ইনজেকশন ব্যবহার করলেও রোজা ভাঙে না।
বাইপাস সার্জারি করা এবং বর্তমানে স্থিতিশীল রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখতে পারেন। শরীরের কষ্ট ও অসুস্থতাকে অবহেলা করা উচিত নয়, ইসলাম সহজ ও মানবিক ধর্ম।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি : হোমিওপ্যাথিতে রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। এ জন্য একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে ডা. হ্যানিম্যান নির্দেশিত হোমিওপ্যাথিক নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়। হৃদরোগসহ যেকোনো জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য, রোগীর লক্ষণসমষ্টি এবং ধাতুগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে করা হয়। আল্লাহর রহমতে, এই পদ্ধতিতে কার্যকরভাবে রোগ নিরাময় সম্ভব।

হোমিওরেমিডি : অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন করেন। সাধারণভাবে যে ওষুধগুলো ব্যবহৃত হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে ক্র্যাটিগাস, অরামেটালিকাম, এডোনিস ভ্যান্যালিস, অর্জুন, আর্নিকা মন্টেনা, গ্লোনয়িন, ভ্যানাডিয়াম, ল্যাকেসিস, ডিজিটালিস, বেলাডোনা, স্পাজিলিয়া, এনথেলমিয়া, ন্যাজাট্রাইপুডিয়ামস, নাক্স ভোমিকা এবং আরও অনেক ওষুধ। এগুলো রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী নির্ধারিত হয় এবং প্রতিটি রোগীর জন্য স্বতন্ত্রভাবে প্রয়োগ করা হয়।

পরিশেষে বলতে চাই, রমজান আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতারও একটি সুবর্ণ সুযোগ। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত জ্ঞান, বাস্তবতা ও দায়িত্ববোধের আলোকে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অনেক হৃদরোগী নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে রোজা রাখতে পারেন। তবে নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। সুস্থ শরীরেই ইবাদত সুন্দর, প্রশান্ত ও পরিপূর্ণ হয়।

লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রবন্ধকার


  বিষয়:   রমজান  হৃদরোগ  ঝুঁকি  করণীয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: