নতুন সরকারের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ

ড. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজদে

মতামত

আজ বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও পাঠকের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে। এটি কেবল

2026-02-26T05:57:03+00:00
2026-02-26T05:57:03+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
অমর একুশে গ্রন্থমেলা
নতুন সরকারের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ
ড. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজদে
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও পাঠকের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি বাঙালির মনন, ইতিহাস এবং রাষ্ট্রচিন্তার গভীর প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের উত্তরাধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই মেলা প্রতি বছর আমাদের সামনে মৌলিক প্রশ্ন তোলে- আমরা কীভাবে ভাবছি, কী পড়ছি এবং রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি। ফেব্রুয়ারি এলেই শহরের ব্যস্ততা, রাজনৈতিক উত্তাপ কিংবা অর্থনৈতিক চাপ অতিক্রম করে মানুষ বইয়ের কাছে আসে। কারণ বই কেবল বিনোদন নয়; বই আশ্রয়, বই প্রশ্ন, বই মুক্তির ভাষা।

২০২৬ সালের বইমেলার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তাদের সামনে আসা প্রথম বড় জাতীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। ফলে এবারের বইমেলা শুধু পাঠকের উৎসব নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক অবস্থানের একটি নীরব পরীক্ষা। বইমেলার প্রাণ পাঠক। স্টলের সংখ্যা, উদ্বোধন অনুষ্ঠান বা অতিথির উপস্থিতি যতই সমৃদ্ধ হোক, পাঠক ছাড়া বইমেলা অর্থহীন। অমর একুশে বইমেলার বিশেষত্ব এখানেই- পাঠক কেবল বই কিনেন না, তিনি অংশগ্রহণ করেন। লেখকের সঙ্গে কথা বলেন, নতুন বই নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন, প্রশ্ন তোলেন এবং পুরোনো বইয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ান। এই দ্বিমত, প্রশ্ন এবং মতবিনিময় সমাজের মননের স্তর নির্ধারণ করে।

ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাস বদলেছে। দ্রুতগতির ভিডিও, সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মানুষ বই পড়ার সময় কম পায়। যা আমাদের কাম্য নয়। তবু বইমেলা প্রমাণ করে- পাঠক হারিয়ে যায়নি, বরং রূপান্তরিত হয়েছে। পাঠক এখন আরও সচেতন এবং নির্বাচনি। নতুন সরকারের জন্য বার্তা স্পষ্ট- মননকে অবহেলা করলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। বইমেলা শুধু বাণিজ্য নয়। প্রকাশকদের টিকে থাকতে বিক্রি প্রয়োজন, তবে বইমেলার আসল শক্তি এখানেই- বই পণ্য হলেও তার আসল পরিচয় চিন্তার বাহন।

এবার বিপুলসংখ্যক প্রকাশনার অংশগ্রহণ প্রকাশনা জগতের প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। এবারে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে, যার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি স্টল, যা মোট ১,০১৮টি একক পাঠক ও লেখককে মিলিত করবে। সংখ্যা বাড়লেই মান বাড়ে না। আজকের পাঠক বিষয়বস্তু, ভাষা, গবেষণা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করেন। সচেতন পাঠকই বইমেলার শক্তি এবং নতুন সরকারের জন্য সতর্কতা-মননকে অবহেলা করলে রাষ্ট্র এগোতে পারে না।

২০২৬ সালের বইমেলা শুরু হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। নতুন সরকারের সামনে মানুষের প্রত্যাশা যেমন বড়, তেমনি প্রশ্নও তীব্র। এবারের বইমেলার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। তবে পাঠকের প্রত্যাশা কেবল আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। পাঠক জানতে চানÑ রাষ্ট্র কি শুধু বইমেলাকে উৎসব হিসেবে দেখবে, নাকি মুক্তচিন্তা, প্রশ্ন ও ভিন্নমতের নিরাপদ পরিসর নিশ্চিত করবে? ইতিহাস দেখিয়েছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করলে তা আরও প্রতিবাদী ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা সেই প্রশ্নেরই একটি প্রাসঙ্গিক মঞ্চ। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো- প্রশ্নকে শত্রু না ভেবে গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা।

বইমেলার বিস্তৃত পরিসর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এই পরিবেশ বইমেলাকে একটি অস্থায়ী নগরের রূপ দেয়। স্টলের বিন্যাস, আলো, প্রবেশপথ এবং বাহিরপথ পাঠকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পাঠক হাঁটতে, দাঁড়াতে, বিশ্রাম নিতে এবং বই নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

শিশুদের জন্য রাখা ‘শিশুচত্বর এবং শিশুপ্রহর’ ভবিষ্যৎ পাঠক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। শিশু যদি বইমেলায় আনন্দ পায়, তবে বই তার কাছে বোঝা নয়, আনন্দের সঙ্গী হয়ে ওঠে। পাঠক প্রতিটি প্রদর্শনী ঘর ঘুরে নতুন বিষয়বস্তু, নতুন লেখক এবং নতুন ধারার বই আবিষ্কার করতে পারেন।

লিটল ম্যাগাজিন চত্বর বইমেলার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। এখানে মূলধারার বাইরে থাকা চিন্তা, পরীক্ষামূলক সাহিত্য এবং নতুন কণ্ঠস্বর স্থান পায়। পাঠকসংখ্যা কম হলেও প্রভাব গভীর। ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ যদি বাস্তব হয়, তবে এই বিকল্প চিন্তার জায়গা সুরক্ষিত রাখা অপরিহার্য। নতুন সরকারের সাংস্কৃতিক দায়িত্বের একটি বড় অংশ হলো এই পরীক্ষামূলক সাহিত্যকে মুক্তভাবে প্রকাশ ও আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া। 

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বইমেলার পাঠককে নাগরিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বই পড়া যেমন মননের পরিচর্যা, তেমনি পরিবেশ রক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব। মেলায় পলিথিনমুক্ত, পরিচ্ছন্ন এবং পরিবেশবান্ধব আয়োজন পাঠককে নৈতিক শিক্ষা দেয়। রমজান মাসে আয়োজন দেখিয়েছে- ধর্মীয় জীবন ও সাংস্কৃতিক জীবন পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং সহাবস্থান সম্ভব।

নিরাপত্তা দরকার, তবে বইমেলায় নিরাপত্তা মানে আতঙ্ক নয়, আস্থা। পাঠক যেন নির্ভয়ে ঘুরতে পারেন, লেখকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, প্রশ্ন তুলতে পারেন। এই পরিবেশ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অতিরিক্ত কড়াকড়ি বইমেলার প্রাণ নষ্ট করে। নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো- নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু মুক্তচিন্তা ও আলোচনা বন্ধ না করা।

বইমেলার পুরস্কার লেখক ও প্রকাশকদের উৎসাহিত করে, তবে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পাঠকের আস্থা। স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা না থাকলে পুরস্কারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাঠকই চূড়ান্ত বিচারক। নতুন সরকার চাইলে এই মেলার মাধ্যমে প্রকাশক, লেখক এবং পাঠকের আস্থার ওপর ভিত্তি করে সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

এবারের বইমেলায় বিশেষভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ। স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শুধু বই কেনার জন্য নয়, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, পাঠচক্র এবং লেখক-পাঠক সংলাপের অংশ হতে আসে। এভাবে বইমেলা শিক্ষামূলক দিক থেকেও নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করছে। একই সঙ্গে ছোট প্রকাশনা, নতুন লেখক এবং নতুন ধারার বইয়ের জন্য এটি একটি শক্তিশালী মঞ্চ। পাঠক এখানে কেবল ক্রেতা নয়, তিনি অংশীদার, মনন-সঞ্চারক এবং সমালোচক।

বইমেলা মানে শুধু স্টল খোলা নয়; রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক অবস্থানও দৃশ্যমান। বই এখনও প্রাসঙ্গিক, পাঠক এখনও সক্রিয়। ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ যদি সত্যিই বাস্তব রূপ পায়, তবে তা বইয়ের পাতায়, পাঠকের চিন্তায় এবং নতুন সরকারের আচরণে স্পষ্ট প্রতিফলিত হতে হবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ সেই পরীক্ষার বড় মঞ্চ। প্রশ্ন একটাই- নতুন সরকার কি এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপ দিতে পারবে?

লেখক ও প্রবন্ধকার



  বিষয়:   অমর  একুশে  বইমেলা  নতুন  সরকার  দায়িত্ব 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: