বর্তমান পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী প্রতিযোগিতা পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। মানুষ ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে তার মনুষ্যত্বের গুণাবলি। পুঁজিবাদী-ভোগবাদী চেতনা লালন করা মুনাফাখোর লোকজন দেশটাকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলছে। কয়েক দিন পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে ক্ষ্যান্ত থাকে। আবার কয়েক দিন আদা-রসুনসহ নিত্যপণ্যের দাম অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
গত দুই দশকে দেশ অবকাঠামোতে এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ছে আরও বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল হয়েছে মানুষ। মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘাড়ে চেপে বসেছে। আগে ১০ টাকায় যে দ্রব্য পাওয়া যেত সেটি এখন ৫০ টাকা। ড্রাইভার, গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুর ও মেহনতি মানুষরা সারা দিন কাজ করে যে মাইনে পায় তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অল্প বেতনে যারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তারা সংসারের হাল ধরতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের পেছনে মানুষের অধিক টাকা খরচ হওয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ, ওষুধ খরচ, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচ জোগান দিতে পারছে না। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানের পাতে মাছ-মাংস, ফলমূল তুলে দিতে পারছে না। এই বাস্তবতা কোটি কোটি মানুষের, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।
গত ২০২৪ সালে ২৪ আগস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে পদ্মা নদীর পানি অনেক গড়িয়েছে। হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলেও তার রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক কার্যক্রম সেভাবে চলছে। জায়গায় জায়গায় বসে আছে সিন্ডিকেট কারসাজির সঙ্গে জড়িত অবৈধ মুনাফাখোর উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শ্রেণি।
এটি বলার অপেক্ষা রাখে যে, উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সেই উৎপাদক শ্রেণির লোকজন যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে তখন জনগণের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘের উদয় হয়।
বিগত সরকারের সঙ্গে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর দহরম-মহরম সম্পর্ক ব্যবসায়ীদের অবৈধ পথে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। হাসিনাও এই সুযোগকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা অর্জন করেছে। বর্তমানে সরকারের পালাবদল হয়েছে কিন্তু সিন্ডিকেটের হাতবদল হয়নি। সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতরা দিব্যি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কার্যত বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীরাই দেশি-বিদেশি বাজারে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে মুনাফাখোরদের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। তাই দ্রব্যমূল্যের এখনই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে অস্থিরতা আরও বাড়বে। সে জন্য উৎপাদক শ্রেণির লোকজনকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। কোনো অবস্থায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ ফায়দা অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। বর্তমানে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান ও অন্যতম কারণ হচ্ছে অবৈধ সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যধিক হারে কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এমন সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর কর-শুল্ক আরোপ করা হয়েছে যা ক্রয় না করে মানুষ জীবন নির্বাহ করতে পারে না। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামালে মাত্রাতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ করায় ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। হাসিনা সরকারের সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ওপর ব্যাপক হারে কর-শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের পকেট খালি করেছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশি-বিদেশি ঋণের চাপ যা এখনও বলবৎ রয়েছে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই অযৌক্তিক হারে বাড়িয়েছে। যার ফল ভোগ করছে সাধারণ গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষ। অতিরিক্ত কর-শুল্ক বৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সব দ্রব্যের দাম অতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্যের চাপের কারণে জিনিসপত্রের দাম জনগণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জনগণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্য কোনো সরকারের সময়ে এত বেশি কর-শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়নি। অন্যদিকে সিন্ডিকেট কারসাজিতে জড়িত ব্যবসায়ীরা যখন-তখন বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে জনগণকে দুইমুখী দাম বাড়ানোর চাপ সইতে হচ্ছে। একদিকে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট কারসাজি করে দাম বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে প্রতিটি বিদেশি পণ্যে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ করায় দ্রব্যমূল্যের দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত সরকার মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে কম দেখিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট খালি করেছে। প্রতিটি দ্রব্যে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ ও সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে যেভাবে প্রভাব পড়েছে।
১ কেজি চিনির ক্রয়মূল্য ৫৫ টাকা হলে বাকি ৩২ টাকা কর-শুল্ক। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের ক্রয়মূল্য ১০৫ টাকার সঙ্গে ৩৮ টাকা কর-শুল্ক আরোপ করায় বাজারে সেই সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ টাকায়। ১ লিটার অকটেনের ক্রয়মূল্য ৫৫ টাকা এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৬০ টাকা কর-শুল্ক আরোপ করায় বাজারে অকটেনের মূল্য ১২৪ টাকা হয়েছে। ১ কেজি মাল্টার ক্রয়মূল্য ৮০ টাকা এর সঙ্গে অতিরিক্র আরও ১৬০ টাকা কর-শুল্ক ধার্য করায় বাজারে ৩০০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। ৯০ টাকা দামের আপেলে ১৯০ টাকার বেশি কর-শুল্ক আরোপ করায় বাজারে তা ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১২০ টাকার আঙুরে অতিরিক্ত ২৫০ টাকা কর-শুল্ক আরোপ করায় বাজারে তা ৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতিটি বিদেশি ফল আমদানিকারকরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করছে।
যাবতীয় ইলেকট্রনিক পণ্য, মোবাইল, রিকন্ডিশন গাড়ি এবং প্রতিটি বিদেশি দ্রব্যে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মোবাইলে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ইন্টারনেট প্যাকেজে ৫০ শতাংশ ট্যাক্স। এভাবে খেজুর, পেঁয়াজ, রসুন, আদা-মসলাসহ সব রকম খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যেটি আমাদের গরিব দেশের জন্য মোটেই সমীচীন নয়। চলমান সংকট থেকে উত্তরণে সহজ পথ হচ্ছে সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করা এবং কর-শুল্কের হার কমিয়ে আনা। এই মুহূর্তে কর-শুল্কের হার একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কমিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক
এফআর