নদীবন্দর ও ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে একসময়ের ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ খ্যাত ঝালকাঠিতে রয়েছে বিভিন্ন কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। মৌসুমি ব্যবসা হিসেবে এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সেমাই কারখানাও। ঈদকে সামনে রেখে জেলাবাসীর সেমাইয়ের চাহিদা পূরণে এসব কারখানায় চলছে পুরোদমে উৎপাদন।
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া উৎপাদন এখন তুঙ্গে।
সেমাই তৈরিতে নিয়োজিত শ্রমিকরা রাতে উৎপাদন কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর দিনের বেলায় চলে প্যাকেটজাত ও সরবরাহের প্রস্তুতি। কারখানার মালিকরা বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দূরত্ব অনুযায়ী ভ্যান, টমটম, মাহিন্দ্র, অটোরিকশা ও পিকআপ ভ্যানে করে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে পাঠানো হচ্ছে সেমাই।
দুধে ভেজা সেমাই, চিকন ঝরঝরে সেমাই, ময়দার সেমাই কিংবা সেমাইয়ের বল ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় এসব বাহারি পদে। রসনার তৃপ্তি মেটাতে সেমাইয়ের জুড়ি নেই। ঈদের সকালে সেমাই মুখে দিয়ে নামাজে যাওয়ার চল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। সামনে অন্য মিষ্টি থাকলেও সেমাই ছাড়া যেন সবই পানসে লাগে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও সমান জনপ্রিয় সেমাই। এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তানেও এর প্রচলন রয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই হাতে তৈরি সেমাই বানানো হতো। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে হাতে তৈরি সেমাইয়ের চল রয়েছে, তবে সময়ের আবর্তে প্যাকেটজাত সেমাই সহজলভ্য হয়েছে। বাংলাদেশে সেমাইয়ের রকমফের থাকলেও স্বাদ একটাই মিষ্টি।
ঝালকাঠিতে মক্কা সেমাই, মদিনা সেমাই, কুলসুম সেমাই কারখানাসহ জেলার অন্যান্য কারখানায় লাচ্ছা ও শলা সেমাই তৈরি হচ্ছে।
পশ্চিম চাঁদকাঠির মক্কা সেমাই কারখানার মালিক আইউব আলী খান জানান, তার কারখানায় লাচ্ছা ও শলা সেমাই উৎপাদন করা হয়। কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা রং ব্যবহার না করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেমাই তৈরি করা হয় এবং পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়।
তিনি বলেন, আমরা নিজেরা এবং আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ঈদের দিন এ সেমাই খাই। নিজেরা যা খাই, সেটাই তৈরি করি। তাতে কেমিক্যাল দিলে ক্ষতি আমাদেরই। এছাড়া প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, সাংবাদিক ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শনে আসেন। কোনো অসংগতি পেলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে, এতে ব্যবসা ও পুঁজিতে ঘাটতি পড়বে। তাই উন্নতমানের উপকরণ দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত সেমাই তৈরি করছি।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, অনেকেই বাসাবাড়িতে চুল্লি বসিয়ে ঈদকে কেন্দ্র করে খোলা সেমাই তৈরি করেন। রং মিশিয়ে তা নজরকাড়া করা হয়, যা মানহীন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে ভালো মানের উৎপাদনকারীরা বদনামের শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে চাহিদাও প্রভাবিত হচ্ছে।
সেমাই তৈরির কারিগর মো. দুলাল হোসেন জানান, তিনি ভোলা থেকে দুই মাসের জন্য ঝালকাঠিতে কাজে এসেছেন। ১৫ জন শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছেন। তাদের কারও কোনো সংক্রামক ব্যাধি নেই। কোনো রং বা কেমিক্যাল ছাড়াই শুধু ময়দা ও পানি দিয়ে শলা সেমাই তৈরি করা হয়। পরে কাঁচা শলা সেমাই তেলে ভেজে লাচ্ছা সেমাই বানানো হয়।
কারখানার ম্যানেজার সবুজ খান জানান, তাদের উৎপাদিত সেমাই ঝালকাঠি শহর ও জেলার বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী উপজেলা যেমন পিরোজপুরের কাউখালী ও ভান্ডারিয়া, বরগুনার বামনা, বরিশালের উজিরপুর ও বানারিপাড়া এবং ভোলার মোকামেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
ঝালকাঠি ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক সাফিয়া সুলতানা জানান, ঝালকাঠির সেমাই কারখানাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আরবিএন