মুসলিম বিশ্বের বলিষ্ঠ নেতার মহাপ্রয়াণ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম কেবল কালির অক্ষরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি জাতির স্পন্দন, একটি বিপ্লবের মশাল

2026-03-02T03:29:47+00:00
2026-03-02T03:36:18+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
আয়াতুল্লাহ খামেনি
মুসলিম বিশ্বের বলিষ্ঠ নেতার মহাপ্রয়াণ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৩:২৯ এএম  আপডেট: ০২.০৩.২০২৬ ৩:৩৬ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম কেবল কালির অক্ষরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি জাতির স্পন্দন, একটি বিপ্লবের মশাল এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী হুঙ্কার। আয়াতুল্লাহ আল-সায়্যিদ আলি হোসাইনি খামেনি ছিলেন তেমনই এক কালজয়ী সত্তা, যার প্রয়াণে আজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি কেবল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মজলুমের কণ্ঠস্বর এবং আধিপত্যকামী শক্তির যমদূত। খামেনি ছিলেন সেই মুক্ত মানবের প্রতীক, যিনি শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছেন আজীবন। তার মহাপ্রয়াণ একটি যুগের অবসান ঘটালেও তার আদর্শের শিখা চিরকাল প্রজ¦লিত থাকবে বিশ্বের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে।

১৯৩৯ সালে ইরানের পবিত্র মাশহাদ নগরীতে এক ধর্মপ্রাণ ও অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর, যা তাকে ‘সায়্যিদ’ মর্যাদায় ভূষিত করে। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছিলেন দারিদ্র্যের কঠোর কশাঘাত। তার পিতা আয়াতুল্লাহ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন অত্যন্ত খোদাভীরু ও কঠোর পরিশ্রমী আলেম, যিনি তার সন্তানদের বিলাসিতা নয়, বরং আদর্শিক সততার শিক্ষা দিয়েছিলেন। 

জ্ঞানার্জনের তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে তিনি মাত্র চার বছর বয়সে মক্তবে যান এবং খুব অল্প বয়সেই কুরআন ও ইসলামি উচ্চতর বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। মাশহাদের পাঠ শেষ করে তিনি নাজাফ ও কোম নগরীর বিখ্যাত মাদরাসাগুলোতে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি সমকালীন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই সময়টি ছিল তার মেধা ও মনন গঠনের শ্রেষ্ঠ সময়। বিদ্রোহী কবি নজরুলের মতো তিনিও যেন বলতে চেয়েছিলেন ‘মম ললাট-রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!’ তার জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরতা তাকে কেবল একজন আলেম হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

কোম নগরীতে থাকাকালে তিনি ইসলামের মহান বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্যে আসেন। খোমেনির আপসহীন নেতৃত্ব এবং ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তরুণ খামেনিকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে। তিনি হয়ে ওঠেন খোমেনির একনিষ্ঠ শিষ্য এবং তার ছায়ার মতো বিশ্বস্ত সহচর। শাহের অপশাসনের বিরুদ্ধে খামেনি যখন রাজপথে নামেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল কেবল বিপ্লবের গান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার সময় এসেছে। যা তাকে পরবর্তী তিন দশক ধরে ইরানকে এক লৌহমানবের মতো আগলে রাখতে সাহায্য করেছে।

বিপ্লবের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। শাহের গুপ্তচর সংস্থা ‘সাভাক’র নির্মম নির্যাতন তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে তাকে ছয়বার কারাবরণ করতে হয়েছিল। অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে নির্জন কারাবাস আর অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেও তিনি সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। এমনকি তাকে তিন বছরের জন্য দুর্গম এলাকায় নির্বাসনেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শোষকের কারাগার তাকে আরও ইস্পাতকঠিন করে গড়ে তোলে। নজরুলের কবিতার মতোই তিনি যেন গেয়ে উঠেছিলেন ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট।’ 

১৯৭৯ সালের সেই ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনি নতুন রাষ্ট্রের অন্যতম কারিগর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অত্যন্ত সংকটময় সময়ে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের তদারককারী হিসেবে কাজ করেন। তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন না, বরং ময়দানের সিপাহসালা হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের রক্তিম সূর্য যখন উদিত হলো, তখন তার হাতেই অর্পিত হলো নবজাতক রাষ্ট্রকে রক্ষার পবিত্র আমানত।

১৯৮১ সালে তিনি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু শোষক চক্রের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। একই বছর একটি মসজিদে বক্তৃতা দেওয়ার সময় এক ভয়াবহ বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। এই হামলায় তিনি তার ডান হাতের কর্মক্ষমতা চিরতরে হারান। এই পঙ্গুত্ব তাকে দুর্বল করেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে। পঙ্গু হাত নিয়েও তিনি যেভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শরীরের অঙ্গহানি হলেও আদর্শের মৃত্যু হয় না। তার সেই পঙ্গু হাতটি আজ বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার এক কালজয়ী স্মারক।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সেই ভয়াবহ আটটি বছর খামেনি ছিলেন সম্মুখ সমরের এক অকুতোভয় সেনানি। রাষ্ট্রপতি এবং সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি রণক্ষেত্রে গিয়ে সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করতেন। যখন বিশ্বের পরাশক্তিগুলো সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করছিল, তখন খামেনি শূন্য হাতে কেবল ঈমানি শক্তি দিয়ে শত্রুকে রুখে দিয়েছিলেন। তার রণকৌশল এবং অদম্য সাহস ইরানকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, সত্যের পথে থাকলে সংখ্যাতত্ত্ব বড় কথা নয়, বরং মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থাই চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি।

১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির প্রয়াণের পর খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। অনেক সমালোচক ভেবেছিলেন তিনি হয়তো দীর্ঘসময় টিকতে পারবেন না, কিন্তু খামেনি তার অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। তিনি ক্ষমতার সব শাখাকে সুসংহত করেন এবং ইরানের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেন। তার ৩৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে ইরান একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি ছিলেন আধুনিক ইরানের আসল স্থপতি।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের কাছে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছিলেন এক জীবন্ত আতঙ্কের নাম। তিনি কখনোই তাদের রক্তচক্ষুুকে পরোয়া করেননি। অর্থনৈতিক অবরোধ ও স্যাংশনের পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি ইরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যদিও তিনি ফতোয়া দিয়েছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র ইসলামবিরোধী, কিন্তু শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানকে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাতারে দাঁড় করিয়েছেন। তার আপসহীন বিদেশনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান পশ্চিমা শক্তিকে বারবার পিছু হটতে বাধ্য করেছে। 

ফিলিস্তিন এবং আল-কুদসকে মুক্ত করার স্বপ্ন ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘ক্যানসার টিউমার’ হিসেবে অভিহিত করতেন এবং একে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার অঙ্গীকার করেছিলেন। হিজবুল্লাহ, হামাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পেছনে তার নৈতিক ও সামরিক সমর্থন ছিল অটুট। আজ গাজা থেকে লেবানন পর্যন্ত যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলছে, তার নেপথ্যে ছিল খামেনির বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনা। তিনি ইরানকে কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, যা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কোনো হিসাব মেলানো সম্ভব নয়।

খামেনি সবসময় মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ ভুলে মুসলমানদের এক পতাকাতলে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বারবার। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মুসলমানদের বিভক্তিই সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তির উৎস। পাশাপাশি, ইরানের ওপর পশ্চিমা অপসংস্কৃতির আগ্রাসন ঠেকাতে তিনি ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’কে এগিয়ে নিয়েছেন। তার মতে, একটি জাতি ততক্ষণ স্বাধীন নয় যতক্ষণ সে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও চিন্তা থেকে বিচ্যুত থাকে। 

ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও আয়াতুল্লাহ খামেনি এক অত্যন্ত সাধারণ ও কৃচ্ছ্রসাধিত জীবন কাটিয়েছেন। তার বাসস্থান এবং আসবাবপত্র ছিল সাধারণ একজন মানুষের মতো। বিলাসবহুল জীবন তাকে কখনোই আকৃষ্ট করতে পারেনি। তার এই অনাড়ম্বর জীবনই তাকে জনগণের হৃদয়ে ঠাঁই করে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা যিনি দিনের বেলা রাজনীতি পরিচালনা করতেন আর রাতের গভীরে জায়নামাজে মহান আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়তেন। তার এই রুহানি শক্তিই ছিল তার রাজনৈতিক সাফল্যের মূল রহস্য।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক পৈশাচিক হামলায় তিনি শাহাদাতবরণ করেন। শত্রুরা ভেবেছিল তাকে হত্যা করলেই বিপ্লবের মৃত্যু হবে। কিন্তু তারা জানে না যে, একজন খামেনির রক্ত থেকে লাখ লাখ বিদ্রোহী জন্ম নেবে। তার মৃত্যুতে আজ তেহরান থেকে বাগদাদ, বৈরুত থেকে গাজা সবখানে হাহাকার। কবির ভাষায় ‘মৃত্যু তোরে ডরাই না আমি, মৃত্যু আমার হাতছানি।’ তিনি চেয়েছিলেন লড়াই করতে করতে শহিদ হতে, আর মহান আল্লাহ তার সেই প্রার্থনা কবুল করেছেন। 

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি চলে গেছেন সত্য, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অপরাজেয় আদর্শ এবং একটি নির্ভীক জাতি। তার মৃত্যু মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বিরাট শিক্ষা শত্রুর কাছে মাথা নত না করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার শিক্ষা। আজ সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষ তার স্মৃতিতে অশ্রুসিক্ত হলেও তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত বলছে, প্রতিরোধ থামবে না। খামেনি ছিলেন একটি জীবন্ত ইতিহাস, যা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। খামেনির আদর্শ যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্যবাদের প্রাসাদে কম্পন ধরাবে এবং বিশ্বময় ইসলামি জাগরণের মশাল হয়ে জ্বলবে। বিদায় হে মহান সিপাহসালার, আপনার এই প্রয়াণ আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক



  বিষয়:   আয়াতুল্লাহ খামেনি  সম্পাদকীয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: