মধ্যপ্রাচ্যে অস্থির ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা!

মো. নূর হামজা পিয়াস

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনী যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে এক নজিরবিহীন ও

2026-03-02T03:36:02+00:00
2026-03-02T03:36:02+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থির ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা!
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৩:৩৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বিমানবাহিনী যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা হয়েছে। এই আকস্মিক আক্রমণ কেবল ইরান নয়, বরং পুরো বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই অভিযানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং বিতর্কিত দিক হলো তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয় বা লিডারশিপ হাউস। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলাটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে ইরানের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া যায়। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের পাশাপাশি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান সদর দফতর এবং পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোর নিকটবর্তী সামরিক স্থাপনাগুলোকেও এই হামলার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আক্রমণের পরপরই তেহরানের বেশ কয়েকটি যাচাইকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, রাজধানীর রাতের আকাশ আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে উঠেছে এবং আকাশজুড়ে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উড়ছে। শহরের বাসিন্দারা শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। পুরো শহরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বিমান বিধ্বংসী কামানের গর্জন শোনা যায়। 

শহরটির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। চিত্রে দেখা যাচ্ছে, লিডারশিপ হাউসের কম্পাউন্ডের বেশ কিছু অংশ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিশেষ করে যে ভবনটিতে সর্বোচ্চ নেতা নিয়মিত দাফতরিক কাজ পরিচালনা করতেন, সেটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়েছে। এই স্যাটেলাইট চিত্রগুলো হামলার ভয়াবহতা এবং লক্ষ্যবস্তুর নির্ভুলতা নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিক মহলে এই চিত্রগুলো আসার পর পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এক শোকাতুর বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আর বেঁচে নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি তার দফতরে অবস্থানকালেই শত্রু বাহিনীর নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে নিহত হন। তার এই মৃত্যুর খবর প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই নেতার প্রস্থান এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি করল।

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করে। ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ইরানের নিয়মিত বাহিনী শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরাক, সিরিয়া এবং লেবানন সীমান্ত দিয়ে এই হামলাগুলো পরিচালনা করা হয়। ইরানের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে যে, এই ‘শহিদি রক্তের’ প্রতিটি ফোঁটার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং আক্রমণকারীদের জন্য নরকের দুয়ার খুলে দেওয়া হবে।

ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় ইরাকের আল-আসাদ বিমানঘাঁটি এবং ইসরাইলের নেভাটিম বিমানঘাঁটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে যে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। 
এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের কম্পন শুরু হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে স্বর্ণ ও ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। 

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের জন্য উভয়পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছে। তবে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে কোনো পক্ষই বর্তমানে আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস জরুরি বৈঠকে বসেছে। এই ক্রান্তিকালে দেশে গৃহযুদ্ধ বা ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সামরিক বাহিনী আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। নেতার মৃত্যুতে জনগণের আবেগ ও ক্ষোভকে কীভাবে সামলানো হবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ইসরায়েল এই হামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, যারা তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানতে চায়, তাদের কোনো ক্ষমা নেই। তারা দাবি করেছে যে, ইরানের পারমাণবিক হুমকি চিরতরে বন্ধ করার জন্য এই ধরনের অভিযান অনিবার্য ছিল। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলার ফলে ইসরাইল দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধের জালে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যৌথ অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন যে, মার্কিন স্বার্থ রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এটি আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। আমেরিকান নাগরিকরা যারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে পেন্টাগন অত্যন্ত সতর্ক। হোয়াইট হাউসের সামনে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যা প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ইরানপন্থি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো, যেমন : হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতি বিদ্রোহীরা আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। তারা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ফ্রন্টে হামলা শুরু করেছে। এর ফলে লেবানন, ইয়েমেন এবং গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পুরো অঞ্চলটি এখন একটি বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। 

যেকোনো যুদ্ধের প্রথম শিকার হয় সাধারণ মানুষ। তেহরানসহ অন্যান্য আক্রান্ত শহরগুলোতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। হাসপাতালগুলোতে আহতের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ও ওষুধের অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ইউরোপের দিকে আবারও এক বিশাল শরণার্থী স্রোত শুরু হতে পারে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং অন্যান্য ত্রাণ সংস্থাগুলো দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই যুদ্ধে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং সাইবার হামলা এবং তথ্য যুদ্ধও সমান্তরালভাবে চলছে। উভয় পক্ষই প্রপাগান্ডা ছড়ানোর মাধ্যমে একে অপরের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছে। ইন্টারনেটে অনেক ভুয়া ভিডিও ও সংবাদ ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। সাইবার কমান্ডগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হ্যাক করার চেষ্টা করছে। স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও বাড়ছে। এটি আধুনিক যুগের এক ‘হাইব্রিড ওয়ার’।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। ইরান তাদের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারে মরিয়া, আর আমেরিকা-ইসরায়েল চায় ইরানের প্রভাব চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো যুদ্ধই চিরকাল চলে না। কোনো এক পর্যায়ে আলোচনার টেবিলে বসতেই হয়। কিন্তু সেই সময় আসার আগে আরও কত প্রাণ ঝরবে এবং কত সম্পদ ধ্বংস হবে, তা বলা মুশকিল। তুরস্ক এবং কাতার মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেও এখনও কোনো ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যায়নি।

তেহরানের এই ভয়াবহ হামলা এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করল। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের মানচিত্র এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ


  বিষয়:   মধ্যপ্রাচ্যে  যুদ্ধ  সম্পাদকীয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: