সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রনায়কের মহাপ্রস্থান

সুমন আমীন

বিবিধ

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ঘুম হারাম করে রাখা এবং বর্তমান পৃথিবীর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সবশেষ ভরসাস্থল আয়াতুল্লাহ

2026-03-04T05:58:45+00:00
2026-03-04T05:58:45+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
বিবিধ
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রনায়কের মহাপ্রস্থান
সুমন আমীন
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ৫:৫৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ঘুম হারাম করে রাখা এবং বর্তমান পৃথিবীর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সবশেষ ভরসাস্থল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আমেরিকা এবং ইসরাইলের সম্মিলিত বিমান হামলায় শাহাদাতবরণ করেছেন। 

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আরব বিশ্বের দেশে দেশে যখন আমেরিকা ও পশ্চিমাদের পা চাটা ভৃত্যরা ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে গণবিচ্ছিন্ন রাজতন্ত্রের মাধ্যমে স্বৈরশাসন চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন বিশ্ব সভ্যতার পিতৃভূমি ইরান বা পারস্য ইসলামি গণবিপ্লবের মাধ্যমে গণমানুষের শাসন কায়েম করে। যা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো বর্বর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ গণতান্ত্রিক শাসন বা জনগণের শাসন বলবৎ থাকলে তা তাদের স্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমাদের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরব বিশ্বকে ভিন্ন মোড়কে পেতে চায়। তারা ভালো করেই জানে, জনগণের শাসক কখনোই দেশবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। যা হয়ে আছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, বাহরাইন, মরক্কো, মিসর প্রভৃতি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানরা। অবাধ ভোগবিলাস আর লুটপাটের বিনিময়ে এসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা আমেরিকার পায়ের কাছে মাথা পেতে রাখে নিজেদের স্বৈরশাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য। 

চারপাশের নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকার এত ভৃত্য দেশ থাকার পরও ইরান আরব বিশ্বে মাথা উঁচু করে সত্য ও স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন রাখে। আর এই সত্য ও স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলার অন্যতম সিপাহসালার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। মূলত তার হাত ধরেই আধুনিক ইরানের এগিয়ে চলা। ১৯৮৯ সালে ইসলামিক বিপ্লব-পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছর ৬ মাসব্যাপী কার্যকালে চারপাশের হাজারো প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ইরানের মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে তিনি অবিচলভাবে তার শাসনকাল চালিয়েছেন। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইমাম খামেনি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ, ফরমান জারিকারী এবং অর্থনীতি, পরিবেশ, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় পরিকল্পনা প্রভৃতি খাতে সরকারি নীতি নির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহীতা। তা ছাড়া সরকারের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর ওপরও খামেনির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে নিয়ন্ত্রণ থাকত। 

আর তার সব প্রভাব, প্রজ্ঞা, মেধা ও পরিশ্রম একমাত্র ইরান ও ইরানের জনগণের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অভিলক্ষ্যকে সামনে রেখেই। হজরত আলি (রা.)-এর বংশে ১৯৩৯ সালের ১৫ জুলাই জন্ম আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলি খামেনি ইরানি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা এবং বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভূমিকা রাখেন। রাজা রেজা শাহ পাহলভির শাসনকালে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি বহুবার কারাবরণ করেন। 

ইসলামি বিপ্লবের পর ১৯৮১ সাল থেকে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। 
আয়াতুল্লাহ খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামের শক্র হিসেবে গণ্য করতেন। কারণ ইরানের গণবিরোধী রেজা শাহ পাহলভির শাসনকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আধা উপনিবেশ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ইরানের আমেরিকা ও ইসরাইলবিরোধী অবস্থান যে সঠিক ছিল তা আমরা দেশ দুটির সাম্প্রতিক ভূমিকা পর্যালোচনা করলেই এর সত্যতা অনুধাবন করতে পারব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে পারমাণবিক বোমার ধ্বংস ক্রিয়া দেখিয়ে যুদ্ধবাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরব ভূমিতে সুদূরপ্রসারী দখলদারিত্ব কায়েম রাখতে কৃত্রিম রাষ্ট্র ইসরাইল সৃষ্টি করে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূমিতে জোরপূর্বক জেঁকে বসা ইহুদিবাদী জঘন্য রাষ্ট্রটি জন্মের পর থেকেই আরব ভূমিতে আমেরিকার পাপেট রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে চলেছে। 

আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থনে ইসরাইল আজ মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া। পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিধ্বংসী সব মারণাস্ত্রে সমৃদ্ধ এক জাহান্নামের নাম এই অবৈধ দেশটি। পৃথিবীতে একক সুপার পাওয়ার বনে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে তার সম্প্রসারিত ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে সাজিয়েছে। ইসরাইল বা আমেরিকার জন্য কিঞ্চিৎ নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে এমন দেশ বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ধ্বংস করতে তারা জাতিসংঘ বা পৃথিবীর কোনো বৈধ আইনকেই তোয়াক্কা করে না।

সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নির্মমভাবে শহিদ করা একই পরিকল্পনার নিখুঁত ছক। আমেরিকার বর্বর ও যুদ্ধবাজ শাসক ডোনাল্ড ট্রাম্প পাশবিক দাম্ভিকতায় তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে, ইমাম খামেনিকে হত্যার নিষ্ঠুর খবর প্রচার করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পাশবিক উল্লাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের উগ্র প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেভাবে মেতে উঠে তাতে পৃথিবীবাসী আদিম বর্বরতার নতুন মোড়ক উন্মোচন দেখতে পায়। 


ক্ষুধার্ত হিংস্র পশু কোনো নিরীহ প্রাণীকে বধের পর যেভাবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু ঠিক সেভাবেই পাশবিক উল্লাসে আজ মাতোয়ারা। তাদের চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক কারণ, আরব বিশ্বে তাদের লুটপাটকে চ্যালেঞ্জ করার মতো আর কোনো লৌহমানবের অস্তিত্ব থাকল না। আরব ভূমির মার্কিন অনুগত রাষ্ট্রগুলো থেকে লুটপাটের অবাধ জ্বালানি পথ হুরমুজ প্রণালিতে এসে বুকে কাঁপন শুরু হবে না আমেরিকাগামী জাহাজের নাবিকদের।

আমেরিকার করদ রাষ্ট্র কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, মরক্কো, মিসরের অবৈধ রাজতান্ত্রিক শাসকরা ভোগে লিপ্ত তাদের অন্ধ জনতাকে ঘুম পাড়িয়ে বিশ্বপ্রভু আমেরিকার সেবার বিনিময়ে নিশ্চিন্তে শাসন করতে পারবে। তাদের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করার কিংবা পবিত্র আরব ভূমিতে মার্কিন-ইহুদি সামরিক উপস্থিতিকে হুংকার ছুড়ে দেওয়ার আর কেউ রইল না। 

জনবিচ্ছিন্ন আরব শাসকরা তাদের প্রতিবেশী দেশ ইরানের গণতন্ত্র কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শাসনকে আতঙ্কের চোখে দেখত। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সবসময় মুসলমান এবং আরব বিশ্বের স্বার্থে আপসহীন। ফিলিস্তিনি জনগণের একনিষ্ঠ সমর্থক ও সাহায্যদাতা হিসেবে মুসলিম বিশ্বে ইরানের সম্মানজনক অবস্থান সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। 

কারণ ইসলামি বিশ্ব দেখতে পায়, যেখানেই ইসরাইল কিংবা আমেরিকা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধ্বংসক্রিয়া চালায় সেখানেই ইরান মজলুমের রক্ষাকর্তা হিসেবে সর্বাগ্রে দাঁড়িয়ে যায়। যা সৌদি আরবের শাসকদের জন্য মারাত্মক আত্মগ্লানির কারণ। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কয়েক সপ্তাহ জোরালো লবিং চালিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ সৌদি আরব। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সৌদি যুবরাজ নিজেই ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে লবিং করেছেন। আর তার সঙ্গে উগ্র জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল তো ছিলই।

কিন্তু কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে কী কোনো মহান আদর্শের শেষ হতে পারে? আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতেও ইরানে খুব বেশি পরিবর্তনের কল্পনা করা আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য আকাশকুসুম স্বপ্ন! পারস্য বা ইরানের হাজার বছরের ইতিহাস রাজতন্ত্র ও বিদেশি আগ্রাসনবিরোধী ইতিহাস। 

সাইরাস দ্য গ্রেটের পারস্য সাম্রাজ্যের বিশ্বজয়ের ইতিহাস আলেকজান্ডারের মতো বহিঃশক্তির আক্রমণে থমকে দাঁড়ালেও সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম সভ্যতার এক তীর্থ ভূমি হয়ে আধুনিক ইরান বিশ্বকে শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞানের সমৃদ্ধির চূড়ান্ত চূড়ায় নিয়ে যায়। বর্তমান মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া প্রভুত্বে আপস না করা স্বাধীনতার শেষ সিপাহসালার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ইরান থমকে দাঁড়াবে এ কথা ভাবা বোকার স্বর্গ বাসের সমতুল্য। ইরানি জাতীর অতীত শৌর্যময় ইতিহাসই ঠিক করে দেবে তাদের আগামীর পথচলা। 

কবি ও প্রাবন্ধিক
  বিষয়:   সাম্রাজ্যবাদী  রাষ্ট্রনায়ক  মহাপ্রস্থান 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: