চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক এলাকায় গলায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত সাত বছরের শিশু ইরার মৃত্যুকে ঘিরে শোক ও ক্ষোভে স্তব্ধ পুরো জনপদ। মৃত্যুর আগে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও সে বারবার ‘পানি’ চেয়েছিল—কিন্তু শ্বাসনালীর জটিল অস্ত্রোপচারের কারণে চিকিৎসকেরা তাকে পানি দিতে পারেননি। এ আক্ষেপ জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ভেঙে পড়েন ইরার চাচা।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ইরার জন্ম কুমিরায় দাদার বাড়িতে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় তারা কাছেই ভাড়া বাসায় থাকতেন। পেশায় রিকশাচালক ইরার বাবা। জন্মভিটায় টান থাকায় ইরা প্রায়ই দাদুর বাড়ি যেত।
রোববার (২ মার্চ) সকাল ৯টার দিকে দাদুর বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না ধরে ইরা। মা তাকে ছোট বোনকে নিয়ে খেলতে বললেও, পরে যাবে বলে বের হয়ে যায় সে। পরিবার ভেবেছিল, মেয়েটি দাদুর বাড়িতেই আছে। কিন্তু দুপুরের দিকে সামাজিক মাধ্যমে ইকোপার্ক এলাকায় গলাকাটা অবস্থায় এক শিশুর ছবি দেখে স্বজনেরা ইরাকে শনাক্ত করেন।
স্থানীয় সড়ক নির্মাণশ্রমিকরা রক্তাক্ত অবস্থায় ইরাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। সেখান থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। প্রায় দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, শুধু গলার ক্ষত নয়—শরীরের ভেতরেও গুরুতর আঘাত ছিল; বিভিন্ন স্থানে কাটা ও জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় পাশের বাসার এক ভাড়াটিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার সঙ্গে ইরার পরিবারের পূর্ব বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে অপরাধ স্বীকার করেছে বলে দাবি পুলিশের। সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা ফরেনসিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অভিযোগ রয়েছে, দাদুর বাড়ি যাওয়ার পথে অভিযুক্ত ব্যক্তি চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে ইরাকে কুমিরা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে ইকোপার্কের নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে হামলার শিকার হয় শিশুটি।
গুরুতর জখম অবস্থায়ও ইরা জঙ্গল থেকে সড়কের দিকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে—যা তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার নির্মম সাক্ষ্য হয়ে আছে।
রোববার রাতে ইরার মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেন।
ইরার মৃত্যুর পর পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবারের দাবি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ কিংবা বিচার বিলম্ব যেন না ঘটে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় তদন্ত, চার্জশিট, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আপিলসহ একাধিক ধাপ রয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হয়। তবে শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালসহ বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, জনবসতি ও পর্যটনকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি জোরদার, সিসিটিভি সম্প্রসারণ, শিশুদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবার-প্রতিবেশীর তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগ—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইরার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য গভীর বেদনার। তার শেষ আকুতি—এক গ্লাস পানি—আজ বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। এখন সবার প্রত্যাশা, আইনের বিধান মেনে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার সম্পন্ন হবে এবং ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই