জাল-নৌকার জীবনে ঋণ আর হতাশা, তবুও নদীকে আঁকড়ে বাঁচার সংগ্রাম

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক যেন এক অবিচ্ছেদ্য সেতু। সেই সেতু ধরে বছরের পর বছর ধরে বেঁচে আছে গাইবান্ধার জেলেরা। জেলার

2026-03-04T13:15:17+00:00
2026-03-04T13:15:17+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
জাল-নৌকার জীবনে ঋণ আর হতাশা, তবুও নদীকে আঁকড়ে বাঁচার সংগ্রাম
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ১:১৫ পিএম   (ভিজিট : ১৪০)
মাছ ধরা নিষিদ্ধ, জেলে তার নৌকা ও জাল নিয়ে ফিরছেন কূলে। ছবি : সময়ের আলো
জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক যেন এক অবিচ্ছেদ্য সেতু। সেই সেতু ধরে বছরের পর বছর ধরে বেঁচে আছে গাইবান্ধার জেলেরা। জেলার মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, এখানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২১ হাজার ৩১০ জন। এর মধ্যে সরাসরি নদ-নদী থেকে মাছ আহরণের সঙ্গে যুক্ত আছেন ৭ হাজার ৬৪২ জন জেলে, যারা তিস্তা, যমুনা, করতোয়া, ঘাঘটসহ প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ-এর বুকে জীবিকা খুঁজে নেন।

জাল আর নৌকা- এই দুই সম্পদই তাদের সম্বল। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে নদীর মেজাজ। এখন আর আগের মতো মাছ ওঠে না জালে। নদীর বুকে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসতে হয় প্রায় শূন্য হাতে। সংসার চালাতে গিয়ে বাড়ছে ঋণের বোঝা, বাড়ছে হতাশা- তবু নদী ছাড়তে পারেন না তারা।

সদর উপজেলার কামারজানী বন্দর এলাকার জেলে নিখিল দাসের জীবন নদীকেন্দ্রিক। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছেন, তার বাবা-দাদারা কীভাবে জাল ফেলে সংসার চালাতেন। এখন সেই নদীতে দাঁড়িয়ে তার চোখে ক্লান্তি। আগে একবার জাল ফেললেই মাছ উঠত। রুই, কাতলা, বোয়াল- কত মাছ ছিল। এক দিনে চার-পাঁচ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করতাম। এখন সারাদিন জাল ফেলে দেড়-দুই হাজার টাকার মাছ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

জীবিকা চালাতে ছয়-সাতজন মিলে মাছ ধরেন তারা। ইঞ্জিনের তেল, জাল মেরামত, খাবারের খরচ বাদ দিলে জনপ্রতি হাতে থাকে গড়ে তিনশ টাকার মতো। সেই টাকায় সংসার চলে না। অনেকেই বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। কেউ পেশা বদলেছেন- দিনমজুর হয়েছেন, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন। কিন্তু নিখিল এখনো নদী ছাড়েননি। বলেন, বাপ-দাদার পেশা। নদী ছাড়া উপায় নাই।


ফুলছড়ি উপজেলার বালাসী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলেরা নৌকা নিয়ে ফিরছেন। নৌকায় মাছ নেই, আছে হতাশা। ২৮ বছর ধরে মাছ ধরা বিমল বিশ্বাস বলেন, এখন নদীতে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে মাঝারি মাছও মেলে না। মাছের এমন আকাল আগে দেখিনি। তার কণ্ঠে আক্ষেপ-এক সময় নদী ছিল সোনার খনি, এখন খনিতেই সোনা নেই।

তিস্তামুখঘাট এলাকার বিদ্যানন্দ বিশ্বাস দুই যুগের বেশি সময় ধরে জেলে। তিনি বলেন, আগে ভেসাল জালে টেংরা, পুঁটি, কই, শিং ধরা পড়ত। এখন নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে পুকুরের চাষের মাছ বিক্রি করছি।

জেলেদের অভিযোগ, নদ-নদীতে চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এসব জালে মা মাছসহ ছোট মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে গেছে, দূষণ বেড়েছে- সব মিলিয়ে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

জেলায় নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমিতি রয়েছে ১২০টি, এসব সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, জেলেদের বড়ো অংশই এখন ঋণের জালে আটকে আছেন- কেউ এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ সংসার চালাতে নতুন ঋণ নিচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার সহায়তা দেয়, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। নিবন্ধিত অনেক জেলে সহায়তা পান না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

জেলার মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ১৮৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের গাইবান্ধা জেলায় ৭টি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা এবং ৮১টি ইউনিয়নের মোট ১ হাজার ২৪৪টি গ্রামে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩২ জন মানুষ বসবাস করেন। এখানে বছরে ৫২ হাজার ৩৭২ মেট্রিকটন মাছের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৪৩ হাজার ৭২ মেট্রিকটন, অর্থাৎ বছরে চাহিদার চেয়ে মাছের ঘাটতি ৯ হাজার ৩০০ মেট্রিকটন। এরমধ্যে ৬টি নদ-নদী থেকে আহরণ হয় মাত্র ২ হাজার ৬৬৫ মেট্রিকটন, বিল-জলাশয় থেকে ১ হাজার ৮৫৪ মেট্রিকটন এবং অবশিষ্ট মাছ সরকারী ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর, প্লাবন ভূমি ও অন্যান্য জলাশয় থেকে আহরণ হয়।

নদ-নদীতে মাছের ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গাইবান্ধার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রাশেদ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে জেলার নদ-নদীগুলোর পানি আগের তুলনায় দ্রুত কমে যাচ্ছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, অনেক স্থানে চর জেগে উঠছে। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ছে।


তিনি আরও জানান, পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে অবৈধ জাল ব্যবহার। নদীতে কিছু জেলে চায়না জাল ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করছেন, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে ছোট মাছ ও পোনা পর্যন্ত ধরা পড়ে যায়। ফলে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বলেন তিনি। ভরা মৌসুমেও প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ ধরা না পড়ার পেছনে এটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জেলেদের বারবার সচেতন করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না বলে আক্ষেপ করেন এই কর্মকর্তা।

নদীদখল ও দূষণের বিষয়টিও স্বীকার করে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, মাছের বিচরণস্থল ও প্রজনন এলাকাগুলোতে কোথাও কোথাও বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, আবার শিল্প ও স্থানীয় বর্জ্যে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ জাল উচ্ছেদ ও দখল-দূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

মাছ না পেয়ে অনেক পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। কারও ঘরে চাল নেই, কারও সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি। কেউ দিনমজুর হয়েছেন, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন। তবু নদী ছাড়তে পারেন না এ যেন এক অদৃশ্য বন্ধন।

বালাসী ঘাটের প্রবীণ জেলে পরেশ সরকার বলেন, ছোটোবেলা থেকে বাপ-দাদার সঙ্গে এই নদীতেই মাছ ধরি। আগে একবার জাল ফেললে নৌকা মাছে ভরে যেত। এখন সারাদিন ঘুরেও জাল-নৌকা-শ্রমিকের পয়সা ওঠে না। তাও নদী ছাড়া আমাদের উপায় নাই।


নদীভাঙন, বন্যা, ঝড়- সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন এখন আরও অনিশ্চিত। নদীর ঢেউয়ের মতোই তাদের জীবনে ওঠানামা। তবে আশা একটিই- যদি নদী বাঁচে, মাছ ফিরে আসে, তবে হয়ত আবারও জাল ভরে উঠবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, অবৈধ জাল বন্ধে কঠোর নজরদারি, নদীর নাব্যতা রক্ষা, প্রজনন মৌসুমে কার্যকর সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি। তা না হলে এই পেশার সঙ্গে জড়িত হাজারো পরিবারের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

জাল আর নৌকার এই জীবনসংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি মানবিক। নদীকে আঁকড়ে বাঁচার লড়াই- যেখানে আশা আর হতাশা পাশাপাশি চলে। তবু প্রতিদিন ভোরে নতুন দিনের আশায় জাল তুলে নেন নিখিল, বিমল বা বিদ্যানন্দরা। হয়তো আজ একটু বেশি মাছ মিলবে- এই আশাতেই তারা নেমে পড়েন প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ-এর বুকে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   জাল  নৌকা  ঋণ  নদী 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: