ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা অনতিবিলম্বে হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত ও এর নেপথ্যের কারণ বের করার দাবি জানান।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসন ভবনের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’, আমার ম্যাম হত্যা কেনো? প্রশাসন জবাব চাই’, ‘আমার ম্যামের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’ ও ‘ইবি কেনো রক্তাক্ত? প্রশাসন বিচার চাই’ স্লোগান দেয়।
এ সময় আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো হলো, অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত করা, হত্যার নেপথ্যের কেউ থাকলে জবাবদিহিতায় নিয়ে এসে তার বিচার নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাসে-হলে-ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এবং কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা, স্মার্ট আইডি ছাড়া কেউ ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবে না (ভ্যানওয়ালা দোকানদার সবাইকে আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করা), ডেইলি বেসিস কর্মচারীদের নেম প্লেটসহ আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, বিভাগীয় আয় ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবরিনা বলেন, আমরা ম্যামের হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে এখানে এসেছি, ম্যাম আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন, একজন কর্মচারী কতটা উগ্র হলে রুমে ঢুকে তাকে হত্যা করতে পারে! এই ঘটনার সাক্ষী অনেকেই আছেন, তাই আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই।
মাস্টার্সের ২৩-২৪ বর্ষের শিক্ষার্থী জোবেন বলেন, এই অন্তঃকোন্দল আজকের না। আমাদের ম্যাম যখন দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেছেন তখন থেকে ব্যর্থ অকার্যকর চেয়ারম্যান হিসেবে প্রমাণ করার জন্য আমাদের কর্মচারী, আমাদের গুটিকয়েক শিক্ষক জড়িত ছিল। স্পষ্ট কথা এটা। আজকে সাধারণ ফজলু থেকে খুনি ফজলু হওয়ার পেছনে আমাদের কর্মচারীরা জড়িত আছে। কারণ সকলের সামনেই অনেকবার কর্মচারীদের বলেছি, আপনারা একটা চেয়ারের সঙ্গে এভাবে ব্যবহার আচরণ করতে পারেন না। আমরা রিকোয়েস্ট করেছি, আমরা ধমক দিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু আমাদের কথা গ্রাহ্য করে নাই। ম্যামকে কালকে হত্যা করা হয়েছে, এর আগে এক বছর ধরে ম্যামকে তিলে তিলে শেষ করা হয়েছে।
২০২০-২১ বর্ষের মাসুদ রানা বলেন, আমার ম্যাম সৎ একজন মানুষ ছিল। সততার পক্ষে কাজ করতো। ভাউচার, বিল-ভাউচার যখন আনতো, তখন হচ্ছে জাস্টিফাই করতো কোন জায়গায় কয় টাকা গেছে। উনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে, এর আগে ডিপার্টমেন্টের টাকা যারা আত্মসাৎ করতেন, উনারা ওই সুযোগটা পাচ্ছিলেন না। ডিপার্টমেন্টের সবকিছু খরচ উনি নিয়ম দেখতেন। এই জিনিসগুলো থেকে ডিপার্টমেন্টে যারা অফিসার, কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন, উনাদের সঙ্গে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। এর আগে চেয়ারম্যান যারা ছিল, তারা ভাউচারের টাকা মিলেমিশে খেত। আজকে যখন খেতে পারছে না, তখন চড়া হয়ে বসছে আমার ম্যামের উপর। এটাই হচ্ছে সত্যি কথা। আমরা মনে করি, হত্যার পেছনে উনাকে ইনফ্লুয়েন্স করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি, ফজলু সাদা-সিধে মানুষ ছিল। উনার ব্যাপারে আমরা রিকোয়েস্ট করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু এই যে সাধারণ থেকে খুনি হওয়া পর্যন্ত একটা মানুষের যাওয়ার পেছনে অবশ্যই কারণ থাকতে পারে। এটা আমরা মনে করি, এটার দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রশাসন কার কাছে বিচার চাইব? আমরা আসলে এই দেশের কাছেও বিচার পাই না, এই প্রশাসনের কাছেও বিচার পাই না। আল্লাহ করবেন বিচার, তবে তারপরও আমরা আশাবাদী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক।
বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, আমি একজন মানুষ হিসেবে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যদি আমি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত থাকি তাহলে আমি নিজেরও শাস্তি দাবি করছি।
জানা গেছে, নিহত আসমা সাদিয়া রুনা কুষ্টিয়া শহরস্থ কোর্টপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট চুক্তিভিত্তিকভাবে শিক্ষকতা করেন। সংসার জীবনে তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জননী ছিলেন।
এদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে তার লাশ জানাজার উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়া পৌর ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ জোহর জানাজা শেষে তার মরদেহ পৌর গোরস্থানে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
এর আগে, বুধবার বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহননের চেষ্টা করেন একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে। পরে তাদেরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সময়ের আলো/জোই