রমজান এলে শহরের চেহারাটাই বদলে যায়। ভোরের আজানের পর রাস্তা নিঝুম, বিকালে বাজারে মানুষের ঢল, রাতে মসজিদে মসজিদে তারাবিহর জামাত। একটা অন্যরকম প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, যেন পুরো মাসটা একটু ভিন্ন নিয়মে চলে। এই মাসটা শুধু রোজার মাস নয়, এটা সংযমের মাস, একে অপরের প্রতি একটু বেশি উদার হওয়ার মাস। চমৎকার আবহাওয়া আর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের রমজান কাটছে।
এরই মাঝে ঈদুল ফিতরের আগমনি বার্তা নিয়ে শহরজুড়ে শুরু হয়েছে কেনাকাটার মহাউৎসব। ছোট-বড় শপিংমল থেকে পাড়ার মোড়ের দোকান পর্যন্ত সবাই সেজেছে নতুন সাজে। ফ্যাশন হাউস, বুটিক হাউস, কাপড়ের বিপণি— সবখানেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন। আর সেই ভিড় আরও টানতে দোকানের মালিকরা ঝুলিয়ে দিয়েছেন রঙিন আলোর সারি। সন্ধ্যা নামলেই চারদিক ঝলমল করে ওঠে সেই আলোর খেলায়, যেন রাতের শহর পরিণত হয় এক আলোর মেলায়।
ব্যবসায়ীদের ভাবনাটা বোঝা যায়। আলোর ঝলকানিতে পিঁপড়ার মতো সারি বেঁধে ছুটে আসুক ক্রেতা, দোকানে দোকানে লেগে থাকুক ভিড়, বিক্রি বাড়ুক, মুনাফা আসুক। রোজার ঈদে ব্যবসায়ীরা বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, শুধু ঈদুল ফিতরের আগের তিন সপ্তাহে সারা দেশে পোশাক ও জুতার বাজারে লেনদেন হয় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল বাজারে নিজের অংশটুকু ধরে রাখতে ব্যবসায়ীরা কোনো ফাঁক রাখতে চান না। এটা দোষের কিছু নয়। আমরাও চাই, সৎ পথে সর্বোচ্চ মুনাফা করুক আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ।
কিন্তু এখানেই একটু থামা দরকার। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, এই ঝলমলে আলোগুলো জ্বালাতে প্রতি রাতে ঠিক কতটুকু বিদ্যুৎ পুড়ছে? একটি বড় শপিংমলে গড়ে পাঁচ থেকে দশ কিলোওয়াটের আলোকসজ্জা চললে প্রতি রাতে ছয় ঘণ্টায় খরচ হয় ৩০ থেকে ৬০ ইউনিট বিদ্যুৎ। শুধু একটি শহরের পঞ্চাশটি বড় দোকান ধরলে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় থেকে তিন হাজার ইউনিটে, প্রতি রাতে। আর দেশজুড়ে হাজার হাজার দোকান যদি একই কাজ করে, তা হলে সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে ঠেকে, ভাবলে চমকে উঠতে হয়।
মনের কোথাও একটা খচখচানি থেকে যায় তাই। রমজান মাস শুরু হতে না হতেই, মাত্র চার-পাঁচ রোজা পার হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেছে এই আলোর মহাযজ্ঞ। মানুষ তখনও রোজার ছন্দে সবে মিলিয়েছে নিজেকে, সেহরি-ইফতারের রুটিনে সবে অভ্যস্ত হচ্ছে শরীর, আর তখনই সন্ধ্যার শহর হয়ে উঠছে আলোর বাজার।
স্বাভাবিক বিবেচনায় রমজানকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম দশ রোজা রহমতের, মাঝের দশ মাগফিরাতের, শেষ দশ নাজাতের। এই বিভাজনটা শুধু ধর্মীয় নয়, জীবনের ছন্দেও এর প্রতিফলন আছে। রমজানের প্রথম ভাগে মানুষ থাকে ইবাদতে মনোযোগী, দুনিয়াবি কোলাহল থেকে একটু দূরে। মাঝামাঝি সময়, অর্থাৎ পনেরো রোজার পর থেকে, ঈদের প্রস্তুতির হাওয়া একটু একটু করে লাগে মনে। কেনাকাটার তাগিদ অনুভব হয়, বাজারে পা বাড়ানোর ইচ্ছে জাগে। সেই সময় থেকে আলোকসজ্জা শুরু হলে একটা যুক্তি দাঁড় করানো যেত। কিন্তু চার-পাঁচ রোজাতেই যখন রাস্তায় রাস্তায় বাতির সারি ঝুলে যায়, তখন সেটা আর উৎসবের আহ্বান থাকে না, পরিণত হয় নিছক বাণিজ্যিক তাড়াহুড়োয়।
এই তাড়াহুড়োর ক্ষতিটা শুধু নান্দনিক নয়, বাস্তবিকও। রমজানের মধ্যবর্তী অংশ থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত হিসাব করলে আলোকসজ্জার সময়কাল দাঁড়ায় প্রায় পনেরো থেকে সতেরো দিনের। অথচ চার-পাঁচ রোজা থেকে শুরু করলে সেই সময়কাল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, পঁচিশ থেকে সাতাশ দিনে। বিদ্যুতের ব্যবহারও সেই অনুপাতেই বাড়ে। একটু ভাবুন, শুধু সময়সীমা অর্ধেক করলেই বিদ্যুতের অপচয়ও প্রায় অর্ধেক কমে আসত। অথচ এই সহজ হিসাবটা কেউ কষতে চায় না, কারণ প্রতিযোগিতার বাজারে থামার অবকাশ নেই কারও।
তা হলে প্রশ্ন হলো, এই অপব্যয়ের মাশুল কে দিচ্ছে? উত্তরটা কঠিন নয়। সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি এখন আর কারও অজানা নয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি, অথচ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন প্রায়ই সেই চাহিদার ধারে-কাছে পৌঁছায় না। এই বছর পরিস্থিতি আরও জটিল। রমজান মাস, গ্রীষ্মকাল আর সেচের মৌসুম একসঙ্গে এসে পড়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা যে পরিমাণে বাড়ছে, সরবরাহ সেই গতিতে বাড়ছে না।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, সংক্ষেপে ডিপিডিসি, ইতিমধ্যে গ্রাহকদের সতর্ক করে বলেছে, লোডশেডিং বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিজে অনুরোধ করেছেন, রমজান মাসে সবাই যেন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতন থাকেন।
রমজানে লোডশেডিং মানে কী, সেটা কি বলে দিতে হবে? সেহরির সময় বিদ্যুৎ নেই, ঘুমের মধ্যে ঘেমে উঠছেন ফ্যান বন্ধ বলে, ইফতারের আগের সেই ক্লান্ত বিকালটা কাটছে অন্ধকারে, তারাবির পর ঘরে ফিরে দেখছেন ঘরভর্তি গরম। এই কষ্ট যাদের সইতে হয়, তারা কিন্তু শপিং মলের আলোয় নেই, তারা আছে সরু গলির ছোট ঘরে। আর শপিং মলের ঝলমলে আলোর বিদ্যুৎ বিল শেষ পর্যন্ত গিয়ে বর্তায় তাদের ওপরেই, লোডশেডিংয়ের রূপ নিয়ে।
এখানে আরেকটা কথা বলা দরকার। বাংলাদেশে বিদ্যুতের সিস্টেম লস এখনও মোট উৎপাদনের প্রায় আট থেকে দশ শতাংশের কাছাকাছি, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ উৎপাদিত বিদ্যুতের একটা বড় অংশ মানুষের ঘরে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পুরোনো তার, অবৈধ সংযোগ আর দুর্বল অবকাঠামোর কারণে। এই অপচয় বন্ধ করতে পারলেই লোডশেডিংয়ের চাপ অনেকটা কমে আসত, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র না বানিয়েও।
তা হলে আমরা কী করতে পারি? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও আসলে কঠিন নয়। ঘরে ফিরে অব্যবহৃত লাইট বন্ধ করুন। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না নামানো, এতেই সাশ্রয় হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ। দিনের আলোয় ঘরের পর্দা সরিয়ে রাখুন, বাড়তি বাতি জ্বালানোর দরকার পড়বে না। রান্না, ইস্ত্রি বা ওয়াশিং মেশিনের কাজ সন্ধ্যার পিক আওয়ারে না করে বরং সকালে সেরে ফেলুন। ইজিবাইক বা অটোরিকশা অবৈধভাবে বাড়ির লাইন থেকে চার্জ না দেওয়া, এটাও একটা বড় সাশ্রয়। আর যদি বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেলের সুযোগ থাকে, সেই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। আর ব্যবসায়ীদের কাছে একটাই অনুরোধ। আলোকসজ্জার খরচটা যদি সামান্য কমিয়ে ক্রেতাদের ছোট্ট একটা ছাড় দেওয়া যেত, মানুষ কিন্তু সেটাই বেশি মনে রাখত। উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের চেয়ে সৎ ব্যবহার আর ন্যায্য দামই দোকানের সবচেয়ে বড় আলো।
তবে সবচেয়ে বড় কথাটা বলতে হয় নতুন সরকারকে। ঈদের আনন্দ শেষ হলেই শুরু হবে বিদ্যুতের আসল পরীক্ষা। এপ্রিল থেকে জুন, এই তিন মাস বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে চাপের সময়। কলকারখানার উৎপাদন, বোরো ধানের সেচ, ঘরে ঘরে ফ্যান আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবকিছু মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা তখন পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ চূড়ায়। এই সময়ে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা, কৃষিতে সেচ অব্যাহত রাখা আর সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি দেওয়া, তিনটি কাজ একসঙ্গে করাটা সরকারের জন্য সত্যিকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে কঠোর নজরদারি চাই। সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে পুরোনো বিতরণ লাইন সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ আর দেরি না করে এখনই নেওয়া দরকার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের সর্বত্র বিদ্যুতের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, যাতে শহর আলোয় ভাসলে গ্রাম অন্ধকারে না ডোবে।
আপাতত আলোর উৎসব চলুক! ঈদের আনন্দে রাঙা হোক চারপাশ। রমজানের এই পবিত্র মাস মানুষের মনে যে সংযম আর সহমর্মিতার বীজ বুনে দেয়, সেটা যেন শুধু রমজানেই থাকে না, ঈদের পরেও টিকে থাকে প্রতিটি মানুষের বুকে। সেই সংযম যদি বিদ্যুৎ ব্যবহারেও একটু প্রতিফলিত হয়, তা হলে উষ্ণ গ্রীষ্মের রাতগুলো কিছুটা হলেও সহনীয় হয়ে উঠবে সবার জন্য। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সুস্থ ও ভালো রাখুন।
লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
এফআর