সংকটে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা

মো. জসিম উদ্দিন

মতামত

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন উন্নয়নের চরম শিখরে আরোহণের স্বপ্ন দেখছি, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—

2026-03-06T05:54:25+00:00
2026-03-06T05:54:25+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
মতামত
মেধা বনাম নৈতিকতা
সংকটে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা
মো. জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ৫:৫৪ এএম   (ভিজিট : ১৯৭)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন উন্নয়নের চরম শিখরে আরোহণের স্বপ্ন দেখছি, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়— শিক্ষা আসলে কী? বর্তমান যুগে শিক্ষা কি কেবল জিপিএ-৫, গোল্ডেন মেডেল কিংবা বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চবেতনের চাকরির নিশ্চয়তা? নাকি শিক্ষা সেই আলোকবর্তিকা, যা একজন মানুষের ভেতরকার সুপ্ত মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলে? 

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘শিক্ষার আসল কাজ হচ্ছে জীবনের সঙ্গে যোগ স্থাপন করা।’ কিন্তু ২০২৬ সালের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে আমরা দেখছি মেধার জয়জয়কার থাকলেও নৈতিকতার চরম আকাল। মেধা ও নৈতিকতার এই বিচ্ছেদই বর্তমান সমাজের অধিকাংশ অস্থিরতার মূল কারণ। তাই শিক্ষার পূর্ণতা আনতে মেধা ও নৈতিকতার একীভূত রসায়ন আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মেধার বিবর্তন ও নৈতিকতার শূন্যস্থান
গত কয়েক দশকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ‘তথ্যনির্ভর’ হয়ে পড়েছে। মুখস্থবিদ্যা আর পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা মেধাবী নির্ধারণ করছি। অথচ নৈতিকতা বা চরিত্র গঠন বিষয়টি পাঠ্যপুস্তক থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ইউনেস্কোর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট বাড়লেও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন তরুণের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। আমরা রোবট তৈরি করতে পারছি, কিন্তু সংবেদনশীল মানুষ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছি। মেধাবী হওয়া সহজ, কিন্তু মানুষ হওয়া কঠিন— এই চরম সত্যটিই আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রকট হয়ে উঠেছে।

তথ্য ও পরিসংখ্যান 

নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেই দুর্নীতির প্রবণতা এবং নৈতিক স্খলন বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে, আর্থিক অপরাধ ও সাইবার ক্রাইমের সঙ্গে জড়িতদের বড় একটি অংশ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেধাবী তরুণ। 

আমাদের দেশেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে জালিয়াতি— সবখানেই তথাকথিত ‘মেধাবীদের’ উপস্থিতি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। গত দুই বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক শিক্ষার অভাব একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিক্ষা যদি নৈতিকতার লাগামহীন হয়, তবে সেই মেধা সমাজের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপই বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

মনুষ্যত্বের বিকাশ : শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিকে তার পরিবেশ ও সমাজের প্রতি সচেতন করা। চরিত্র গঠন ছাড়া শিক্ষা কেবল একটি সার্টিফিকেট-সর্বস্ব প্রক্রিয়া।  ‘পারফেকশন’ বা পূর্ণতা তখনই আসে যখন মেধা ও নৈতিকতা হাত ধরাধরি করে চলে। 

একজন ডাক্তার যদি অত্যন্ত মেধাবী হন কিন্তু তার মধ্যে যদি মানবিকতা না থাকে, তবে তিনি সেবকের বদলে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। একইভাবে একজন প্রকৌশলী বা প্রশাসক যদি নৈতিকতাহীন হন, তবে তার মেধা দেশ গড়ার বদলে দেশ লুণ্ঠনে ব্যবহৃত হয়।

​শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ভূমিকা
চরিত্র গঠন কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে নৈতিকতার চারণভূমি। ২০২৬ সালের আধুনিক শিক্ষাক্রমে ‘ভ্যালু বেজড এডুকেশন’ বা মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তবে কেবল বিদ্যালয়ের ওপর দায় চাপালে চলবে না, চরিত্র গঠনের প্রাথমিক পাঠশালা হলো পরিবার। 

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলায় পরিবার থেকে সততা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহমর্মিতার শিক্ষা পায়, কর্মজীবনে তাদের সাফল্যের হার ও স্থায়িত্ব অন্যদের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। মেধার সঙ্গে যখন নৈতিকতার সমন্বয় ঘটে, তখন সেই ব্যক্তি কেবল নিজের নয়, বরং গোটা জাতির সম্পদ হয়ে ওঠেন।

ডিজিটাল যুগে নৈতিক চ্যালেঞ্জ
আমরা এখন চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশনের এই যুগে মেধা এখন হাতের মুঠোয়। গুগল বা চ্যাটজিপিটি মুহূর্তেই কোটি কোটি তথ্য দিতে পারে। 

কিন্তু কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ— এই বিচার করার ক্ষমতা বা ‘বিবেক’ কেবল মানুষেরই আছে। প্রযুক্তির এই জোয়ারে যদি নৈতিকতার শক্ত ভিত্তি না থাকে, তবে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্তির চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে। সাইবার বুলিং, ভুয়া খবর প্রচার এবং অনলাইনে নৈতিক স্খলন রোধে শিক্ষার সঙ্গে চারিত্রিক দৃঢ়তার বিকল্প নেই।

জেন-জি ও ডিজিটাল নৈতিকতা
বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা, যাদের আমরা জেন-জি হিসেবে চিনি, তারা প্রযুক্তির অবারিত সুযোগের মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের মেধা ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশ্নাতীত, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে তাদের নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অনলাইন বুলিং, গুজব ছড়ানো কিংবা অনৈতিক কনটেন্ট নির্মাণের এই যুগে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘ডিজিটাল এথিক্স’ বা ডিজিটাল নৈতিকতা।

মেধার জোরে তারা হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠছে, কিন্তু এই মেধা যদি পরমতসহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতা সমাজের জন্য এক বিশাল ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আগামীর পৃথিবীর নেতৃত্ব দিতে হলে তরুণদের মেধার পাশাপাশি চারিত্রিক শুদ্ধতার চর্চায় মনোযোগী হতে হবে।

জাতীয় উন্নয়নে নৈতিক মেধার গুরুত্ব
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য কেবল জিডিপি বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুশাসন ও ন্যায়বিচার অপরিহার্য, যা কেবল নৈতিকতাসম্পন্ন মেধাবীদের দ্বারাই সম্ভব। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। মেধা দিয়ে তারা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে আর নৈতিকতা দিয়ে সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করবে। এই দুইয়ের রসায়নই একটি রাষ্ট্রকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী করে তোলে।

নৈতিক শিক্ষা : নীতিতে আছে, বাস্তবে নেই
আমাদের শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও নাগরিক দায়িত্বের কথা নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। নৈতিক শিক্ষা আলাদা একটি অধ্যায় বা বইয়ে বন্দি থেকে যায়, মূল শিক্ষাপ্রবাহ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে তার কার্যকর সংযোগ গড়ে ওঠে না। ফলে শিক্ষার্থীর কাছে নৈতিকতা হয়ে ওঠে পরীক্ষায় না আসা একটি ঐচ্ছিক বিষয়। 

অথচ চরিত্র গঠন কোনো অতিরিক্ত পাঠ নয়, এটি হওয়া উচিত শিক্ষার প্রতিটি স্তরের অন্তর্নিহিত দর্শন। শিক্ষক নিয়োগ, পাঠদানের পদ্ধতি, সহশিক্ষা কার্যক্রম এমনকি পরীক্ষার মূল্যায়নেও নৈতিক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন না থাকলে শিক্ষা কখনোই পূর্ণতা পায় না। নীতির সঙ্গে প্রয়োগের এই দূরত্বই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর সংকট।

মেধা হলো একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনের মতো, আর নৈতিকতা হলো তার স্টিয়ারিং। ইঞ্জিন যত শক্তিশালীই হোক না কেন, স্টিয়ারিং ঠিক না থাকলে দুর্ঘটনা অনিবার্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেখানে একজন শিক্ষার্থী কেবল ভালো ফলই করবে না, বরং একজন ভালো মানুষ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করবে। জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতার চেয়ে সৎ মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি জরুরি। শিক্ষার পূর্ণতা তখনই আসবে যখন প্রতিটি মেধাবী প্রাণ হবে একেকটি নৈতিকতার আলোকবর্তিকা। মেধা আর নৈতিকতার এই একীভূত রসায়নই পারবে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর।

এফআর


  বিষয়:   মেধা  বনাম  নৈতিকতা  সংকট  শিক্ষাব্যবস্থা 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: