ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় মূল হত্যাকারী ফজলুর রহমানসহ বিভাগের দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সন্ধ্যায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় নিহতের স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুদ রানা।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক কর্মচারী ও উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান।
মামলার এজাহারে ইমতিয়াজ সুলতান অভিযোগ করেন, আমার স্ত্রী আসমা সাদিয়া রুনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালে আসামি খন্দকার ফজলুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহকারী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। রুনা সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি (চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে আসামি শ্যাম সুন্দর সরকার তার সভাপতিত্ব গ্রহণের সময় বিভাগের পূর্ববর্তী আয়-ব্যয়ের হিসাব বুঝিয়ে দেননি। একই সময়ে আসামি বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস আমার স্ত্রীকে বলেন যে, আপনি সভাপতি হয়েছেন, আমরা যেভাবে বলব এবং যেভাবে কাগজ সামনে ধরব, আপনি শুধু তাতে স্বাক্ষর করবেন। আমার স্ত্রী সে কথায় বিস্মিত হয়ে তাদেরকে জানান যে বিভাগীয় অর্থ বিভাগের আমানত এবং তা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ব্যয় করতে হবে; কোনো ধরনের অপব্যবহার করা যাবে না। এরপর থেকেই আমার স্ত্রী রুনার সঙ্গে বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস এবং শ্যাম সুন্দর সরকারের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
ইমতিয়াজুর সুলতান অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস ও শ্যাম সুন্দর সরকার উভয়ে মিলে অফিস সহায়ক খন্দকার ফজলুর রহমানকে দিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার রুনাকে অসহযোগিতা ও হেনস্থা করতে থাকে। একপর্যায়ে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে অসহযোগিতা করার অভিযোগে ফজলুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তিনি লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস ও শ্যাম সুন্দর সরকারের প্ররোচনায় ফজলুর পুনরায় আমার রুনার সঙ্গে অসহযোগিতা ও খারাপ আচরণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে মো. হাবিবুর রহমানের সম্মুখে ফজলুর রুনার সঙ্গে অপমানজনক শব্দ ও অশালীন আচরণ করেন। কিন্তু মো. হাবিবুর রহমান এ বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি।
এ ছাড়া এমতিয়াজুর সুলতান মামলার এজহারে অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে আমার স্ত্রী আসমা সাদিয়া রুনা বিষয়টি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. রোকসানা মিলি ম্যাডামকে মৌখিকভাবে অবহিত করেন। ডিন মহোদয়া ড. রোকসানা মিলি বিভাগে একাডেমিক কমিটির সভা আহ্বান করার নির্দেশ প্রদান করেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী আমার স্ত্রী আসমা সাদিয়া রুনা বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভা আহ্বান করেন। উক্ত সভায় ডিনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক কারণে খন্দকার ফজলুর রহমানকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মো হাবিবুর রহমান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি আমার স্ত্রী আসমা সাদিয়া রুনাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন যে, খন্দকার ফজলুর রহমান উক্ত বিভাগেই বহাল থাকবে। যদিও একাডেমিক কমিটির সভায় তার সম্মতিতেই সর্বসম্মতিক্রমে খন্দকার ফজলুর রহমানকে বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে হাবিবুর রহমান প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর বিভাগীয় চেয়ারম্যান হওয়ার দুরভিসন্ধি পোষণ করতে থাকেন। এরই মধ্যে প্রশাসনিকভাবে ফজলুর রহমান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি হয়ে সেখানে কর্মরত ছিলেন এবং বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাসকে গত (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক বদলির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস ওই দিন থেকে রুনার সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ করেননি। বরং তাকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভাগে এসে নতুন যোগদানকারী ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু অদ্যাবধি তিনি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। গত (৪ মার্চ) বিভাগীয় ইফতার ও আলোচনা সভা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে অফিস সময় শেষে বিকাল সাড়ে তিনটার পর রুনা থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের ২য় তলায় সমাজকল্যাণ বিভাগের ২২৬ নং কক্ষে তার অফিসে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস, শ্যাম সুন্দর সরকার এবং মো. হাবিবুর রহমানের সরাসরি প্ররোচনা ও নির্দেশনায় ফজলুর ধারালো ছুরি নিয়ে আমার স্ত্রীর অফিস কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেয় এবং তাকে হত্যার নিমিত্তে গলার নিচ থেকে বুক পর্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। আমার স্ত্রী প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে তার হাতের আঙুল কেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়।
আমার স্ত্রীর ডাক-চিৎকারে বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা ঘটনাস্থলে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। তখন খন্দকার ফজলুর রহমান তার কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের গলায় আঘাত করার চেষ্টা করলে উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ধরে ফেলে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রুনাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, আমি হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমাকে কেন ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হয়েছে, তা আমি জানি না। যদি আমি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত থাকি, তাহলে আমি নিজেরও শাস্তি দাবি করছি।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকারকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
এছাড়া এ বিষয়ে জানতে অন্য অভিযুক্ত বিভাগটির সাবেক কর্মচারী ও উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাসকে কল দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ রানা বলেন, এ ঘটনায় মামলা সম্পন্ন হয়েছে এবং চারজনের নামে মামলা করেছেন নিহতের স্বামী। আসামিদের ধরতে ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।
সময়ের আলো/জোই