ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার আজ অষ্টম দিন চলছে। হামলার প্রথম দিন শনিবারেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর থেকেই তেহরান পাল্টা হামলা শুরু করেছে। এসব সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে নয়জন, আর ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় সংঘাত ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে আর হামলা করবে না ইরান
ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এখন থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আর কোনো আক্রমণ চালানো হবে না। তবে যদি ওই দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়, তখনই কেবল পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি গত কয়েক দিনে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হওয়া হামলার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা চান।
আমিরাত ও কুয়েতে হামলায় রাডার, জ্বালানি স্থাপনা ও রানওয়ে ধ্বংস
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, এই দুই দেশে মার্কিন অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে সমন্বিত ও ব্যাপক আক্রমণ চালানো হয়, যেখানে অত্যাধুনিক মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, এই অভিযানে আইআরজিসির প্রধান লক্ষ্য ছিল আমিরাতের আল দাফরা বিমানঘাঁটি। সেখানে ড্রোন এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত করা হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, হামলায় একটি উন্নত আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি এমকিউ–৯ ড্রোন রক্ষণাবেক্ষণ হ্যাঙার এবং ইউ–২ নজরদারি বিমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতেও তীব্র মিসাইল হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে তারা। ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই ঘাঁটির রাডার ব্যবস্থা, জ্বালানি মজুত কেন্দ্র এবং মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের দুটি রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আরব দেশগুলোতে ইরানের হামলা নিয়ে আরব লিগের জরুরি বৈঠক
বিভিন্ন আরব দেশের ভূখণ্ডে ইরানের সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে আলোচনা করতে আগামী রোববার আরব লিগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জরুরি বৈঠকে বসবেন। জোটের সহকারী মহাসচিব হোসাম জাকি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, জর্ডান এবং মিসর।
ইরানজুড়ে রাতভর ৮০ যুদ্ধবিমানের হামলা, নিক্ষেপ ২৩০ বোমা
গত রাতজুড়ে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ৮০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে অংশ নেয় এবং বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ২৩০টি বোমা ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
তাদের দাবি অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আইআরজিসির একটি সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের অবকাঠামোসহ একটি গুদাম এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ও সংরক্ষণের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা।
তবে ইসরায়েলি বাহিনী এসব স্থাপনার নির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি।
হরমুজ প্রণালীর কাছে ড্রোনের ধাওয়ায় সরে যায় মার্কিন রণতরি ‘আব্রাহাম লিংকন’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তাদের নৌবাহিনীর ড্রোনের ধাওয়ার মুখে হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানি সংবাদ সংস্থা মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান যে রণতরিটি প্রণালীর প্রায় ৩৪০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসার পর ইরানি ড্রোন সেটিকে লক্ষ্য করে তাড়া করে।
তিনি বলেন, ইরানি জলসীমার কাছাকাছি আসার পর রণতরিটি হামলার আশঙ্কায় এর পাহারাদার জাহাজগুলোসহ দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়ানোর আশঙ্কা
গত রাতের টানা ও তীব্র বিমান হামলার পর ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ।
এর আগেও এই সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল, তবে হামলার তীব্রতা অব্যাহত থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, আবাসিক এলাকাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতাল, স্কুল এবং পার্কিং এলাকাও হামলার শিকার হয়েছে।
তেহরানের ‘পুলিশ পার্ক’ নামের একটি পার্কেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ইরানজুড়ে বিস্তৃত এলাকায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ
কাতারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকান নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দূতাবাস নাগরিকদের নিয়মিত ইমেইল পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে নতুন কোনো নির্দেশনা বা শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত জানা যায়। একই সঙ্গে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করল সৌদি আরব
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোঁড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল বা এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এর আগে শনিবার সকালে চারটি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাঙ্কারে আশ্রয় নিল লাখো ইসরায়েলি
মধ্যরাতের পর থেকে ইরান ইসরায়েলের দিকে অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে রাতভর লাখ লাখ ইসরায়েলি নাগরিককে আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টারে অবস্থান করতে হয়েছে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, যাতে মানুষকে দীর্ঘ সময় শেল্টারে থাকতে হয় এবং সরকারের ওপর মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইরান থেকে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের দাবি, ইরানের স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলার কারণে দেশটির সামরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই সংখ্যা কম হয়েছে।
ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে উপহাস ইরানি কর্মকর্তাদের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনে তার ভূমিকার কথা বলায় তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক আব্বাস আসলানি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এসব বক্তব্যকে ইরান ‘সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেছে। তার মতে, ইরান এখন শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দিকেই সংকেত দিচ্ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হতে পারে
যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি।
ব্রিটিশ পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়বে, বিভিন্ন পণ্যের সংকট তৈরি হবে এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে।
ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো। এর ফলে বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে।
ইরানে সবচেয়ে বড় বোমা হামলার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই হামলার লক্ষ্য হবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো, যাতে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বড় আঘাত পায়।
তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ
তেহরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক বিমানবন্দর মেহরাবাদে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিমানবন্দরে একটি জ্বলন্ত বিমান এবং ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও বিমানবন্দরের কিছু অংশে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে।
ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে নতুন দফায় ব্যাপক বিমান হামলার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে ৪ মার্চও একই বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছিল।
তখন ইসরায়েল দাবি করেছিল, বিমানবন্দরের প্রতিরক্ষা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং হেলিকপ্টার তৈরির কারখানা তাদের জন্য বড় হুমকি ছিল।
তেলক্ষেত্র ও বিমানঘাঁটিতে হামলা প্রতিহত করার দাবি সৌদি আরবের
সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, একটি তেলক্ষেত্র ও একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো বড় ধরনের হামলা তারা প্রতিহত করেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, দক্ষিণাঞ্চলের রুব আল খালি মরুভূমি এলাকায় ছয়টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল শায়বাহ তেলক্ষেত্র।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর তথ্য অনুযায়ী, এই তেলক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয়।
এ ছাড়া প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোঁড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
/ইউএমএইচ