বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ গভীর সংকটে

মো. নূর হামজা পিয়াস

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ ক্রমে বাড়ছে, যা এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ভূ-রাজনীতির এই সংঘাত সরাসরি আঘাত

2026-03-08T03:53:30+00:00
2026-03-08T03:53:30+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
হুরমুজ প্রণালি বন্ধ
বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ গভীর সংকটে
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ৩:৫৩ এএম   (ভিজিট : ১৫২)
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ ক্রমে বাড়ছে, যা এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ভূ-রাজনীতির এই সংঘাত সরাসরি আঘাত হানছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। শক্তিধর দেশগুলোর সামরিক মহড়া এবং পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারগুলো এখন চরম অস্থির। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা আমদানিকৃত জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই সংকট এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে জ্বালানি খাত। আমাদের দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে কলকারখানা সবই এই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে। এই সংকটের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি হলো ‘হুরমুজ প্রণালি’। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু পথটি দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। বর্তমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রণালিটি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পথ রুদ্ধ হওয়া মানে হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। হুরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বাংলাদেশের মতো আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এক মহাবিপদ সংকেত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি ও এলএনজি আমদানি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিবহন, ভারী শিল্প কারখানা এবং এমনকি গৃহস্থালি গ্যাসের চাহিদা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। জ্বালানির এই সরবরাহ সংকট কেবল ভোগান্তি বাড়াবে না, বরং উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত করে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরবরাহ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের দামে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে অনেক ওপরে উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই দাম বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। একদিকে ডলারের সংকট, অন্যদিকে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়া মানেই হলো প্রতিটি পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাক রফতানির জন্য আমাদের শিপিং রুটগুলো হুরমুজ এবং সংলগ্ন সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। এখন যুদ্ধাবস্থার কারণে স্বাভাবিক পথ ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে জাহাজগুলোকে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ঘুরপথে পণ্য পরিবহন করতে হবে। এতে পণ্য পৌঁছাতে যেমন সময় বেশি লাগবে, তেমনি রফতানি খরচও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাসের এটিই প্রধান কারণ হতে পারে।

কেবল পোশাক নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা সবজি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করা হয়। হুরমুজের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই রফতানি বাজারটি এখন প্রায় বন্ধের পথে। পচনশীল এসব পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে রফতানিকারকরা বিশাল অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়বেন। কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার চাষি ও ব্যবসায়ী এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ইরানে আগ্রাসন এবং আকাশসীমা ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার প্রভাব সরাসরি আকাশপথেও পড়েছে। যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের ওপর দিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় রুট পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে বিমানের জ্বালানি খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ফ্লাইট সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমান ভাড়া ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা বা প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশ 

গমনাগমন কঠিন হয়ে পড়ছে। আকাশপথের এই ব্যয়বৃদ্ধি সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এক প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। রফতানি আয় কমার ঝুঁকি এবং আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট হবে। আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বাড়লে স্থানীয় উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার ফলে দেশীয় শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই বিকল্প উৎস এবং বাজার খোঁজার জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।

হুরমুজ প্রণালি বন্ধের খবরের পরপরই বিশ্বের বেশির ভাগ বড় শিপিং কোম্পানি নতুন করে পণ্য পরিবহনের বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যারা বুকিং নিচ্ছে, তারাও এখন উচ্চহারে সারচার্জ বা বাড়তি যুদ্ধকালীন মাশুল দাবি করছে। জাহাজ মালিকরা এখন নিরাপদ রুট নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ব্যয় হিসাব করতে ব্যস্ত। পণ্য পরিবহনের এই অনিশ্চয়তা আমাদের আমদানিকারকদের জন্য এক চরম দুঃসংবাদ। অনেক জাহাজ মাঝপথে আটকা পড়ায় কাঁচামালের সংকটে কারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলো এখন নতুন রুট নির্ধারণ ও সম্ভাব্য ব্যয় হিসাব করে পণ্য পরিবহনের খরচ নবায়ন করছে। এই বর্ধিত পরিবহন ব্যয় সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। লজিস্টিক খরচ বাড়ার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। এটি দেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে। মুদ্রাস্ফীতির এই লাগামহীন দৌড় আমাদের অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিশাল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। 
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে সারের উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবে সার কারখানাগুলো যদি পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে না পারে, তবে কৃষকদের সময়মতো সার সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এর ফলে ধান ও 
অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যুদ্ধের প্রভাব এভাবে পরোক্ষভাবে আমাদের থালার ভাতের ওপরও আঘাত হানছে। কৃষি খাতকে সুরক্ষা দিতে বিকল্প জ্বালানি ও সারের মজুদ বাড়ানো প্রয়োজন।

গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিং বাধ্যতামূলক হয়ে পড়বে। টেক্সটাইল, স্টিল ও সিমেন্ট কারখানার মতো বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী নয় এমন শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খাবেন, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। শিল্পের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা না গেলে রফতানি বাজারে আমাদের দীর্ঘদিনের অর্জনগুলো ধুলোয় মিশে যেতে পারে। জ্বালানি সাশ্রয়ে এখন থেকেই কঠোর নীতি প্রয়োজন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইরান বা এর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন থমকে গেলে শ্রমিকদের বেতন অনিয়মিত হতে পারে বা অনেককে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। রেমিট্যান্স হ্রাসের পাশাপাশি এই ‘রিভার্স রেমিট্যান্স’ বা শ্রমিকদের প্রত্যাবাসন দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রম বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একক কোনো অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের এখন দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা প্রয়োজন। যদি আমরা নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের বৈশ্বিক সংকটে আমাদের অর্থনীতি বারবার মুখ থুবড়ে পড়বে।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে এক সুসমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিকল্প আমদানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে এখনই যোগাযোগ শুরু করা উচিত। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ এবং শুল্ক হ্রাসের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে হুরমুজ প্রণালি সচল রাখার দাবি জানানো এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার চুক্তি জোরদার করা জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি এক কঠিন বাস্তবতা। জ্বালানি সংকট, রফতানি হ্রাস এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এই ত্রিমুখী আঘাত সামাল দিতে হলে এখনই দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ


  বিষয়:   সম্পাদকীয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: