ড. ইউনূস, ক্ষমা করবেন

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মতামত

আমরা ইতিহাসের এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিদায় জানালাম ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। একটি ভাঙা রাষ্ট্রকাঠামো, রক্তাক্ত জনপদ, অস্থিরতার ক্ষত, চরম অনাস্থার

2026-03-08T03:59:20+00:00
2026-03-08T03:59:20+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
মতামত
ড. ইউনূস, ক্ষমা করবেন
শহীদুল্লাহ ফরায়জী
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ৩:৫৯ এএম 
ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংগৃহীত ছবি
আমরা ইতিহাসের এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিদায় জানালাম ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। একটি ভাঙা রাষ্ট্রকাঠামো, রক্তাক্ত জনপদ, অস্থিরতার ক্ষত, চরম অনাস্থার জমাটবদ্ধআবহ এবং ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্থপতিদের আহ্বানে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাঝে নতুন আশা এবং প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠলেন। সীমাবদ্ধতা ছিল পাহাড়প্রমাণ, ছিল ভুলত্রুটির কাঁটাঘেরা পথ, আর ব্যর্থতার দায়ও হয়তো কম ছিল না। কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মাঝেও যা দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, তা হলো তার অটল সাহস, হিমালয়সম ধৈর্য এবং রাষ্ট্রকে একটি স্থিতিশীল কক্ষপথে ফেরানোর আপসহীন প্রচেষ্টা।

গণঅভ্যুত্থান হলো রাষ্ট্র ও সমাজের বিদ্যমান কাঠামোর প্রতি জনগণের সম্মিলিত অনাস্থা, ক্ষোভ এবং আকাক্সক্ষার প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ। এটি জনগণের আত্মত্যাগ, রক্ত আর অদম্য সাহসের মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে। অভ্যুত্থানের সাফল্যের পর জন্ম নেয় আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। শোষণ ও বঞ্চনার অবসান হবে, বৈষম্য বিলুপ্ত হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু রাতারাতি রাষ্ট্র বদলে যায় না। কারণ, রাষ্ট্র কেবল শাসকের পতন নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক এবং নৈতিক কাঠামোর জটিল মিশ্রণ। তাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রে তিনটি মৌলিক সংকট সৃষ্টি হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়েই রাজনৈতিক দলসহ অনেকেই সরকারের বিরোধিতা শুরু করে। যখন চারদিকে সংশয় আর কটুশ্রাব্য সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন একটি নতুন ভোরের বীজ বুনতে। অবশেষে সেই ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে, অগণিত মানুষের রক্তের ঋণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নিশ্চিত করলেন। দেখিয়ে দিলেন যে, ক্ষমতার চেয়েও বড় হলো গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের মর্যাদা।

পদত্যাগের এই বিদায়বেলা আসলে কোনো প্রস্থান নয়, বরং এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনালগ্ন। রাষ্ট্র পরিচালনা খুবই জটিল এক প্রক্রিয়া। এটা কোনো চটকদার প্রদর্শনী নয়, বরং এক নিভৃত, ধীর এবং প্রায় অদৃশ্যসংগ্রাম। বিনাশ ঘটে ঝড়ের বেগে, কিন্তু শৃঙ্খলা ফিরে আসে অতি সন্তর্পণে, বিন্দু বিন্দু বিবর্তনে। সময়ের এই দুর্গম পথযাত্রাকে অনুধাবন করতে না পারলে, যেকোনো মূল্যায়নই হবে অগভীর এবং সত্যবিচ্যুত।

সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণস্পন্দন, কিন্তু সেই সমালোচনারও একটি নিজস্ব নৈতিকতা, পরিমিতি এবং মার্জিত ভাষা থাকা আবশ্যক। নীতির বিরোধ বা সিদ্ধান্তের কঠোর ব্যবচ্ছেদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্র হনন কিংবা কারও মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করা সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়, তা স্রেফ বিদ্বেষ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা টকশো, গণমাধ্যম কিংবা জনসভায় এমন এক অপসংস্কৃতি দেখছি, যেখানে যুক্তির চেয়ে কটূক্তি মুখ্য হয়ে উঠেছে। ড. ইউনূসের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে যখন বলা হয় ‘তিনি পালাবার পথ পাবেন না’, কিংবা তাকে ‘ক্ষমতালোভী’ আখ্যা দিয়ে অহেতুক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং আমাদের সামগ্রিক রুচিবোধকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এমনকি তার বিশ্বস্বীকৃত নোবেল অর্জনকেও তুচ্ছজ্ঞান করার যে হীনম্মন্যতা আমরা দেখি, তা প্রমাণ করে যে, আমাদের ব্যক্তিগত রোষ কখনো কখনো জাতীয় গৌরবের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এই ঘৃণা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি, গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। কিন্তু তার জবাব কী ছিল? তিনি হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করেননি, কোনো অভিযোগ করেননি, এমনকি কোনো বিদ্বেষও  প্রকাশ করেননি। এটিই ছিল তার পক্ষ থেকে ক্ষমার সেই মহৎ দৃষ্টান্ত। 

বিদায় ভাষণেও তিনি অপমান বা কটূক্তির প্রসঙ্গ তোলেননি। যেন ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও অপমানকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের তুলনায় অনেক ছোট করে দেখেছেন। এই নির্লিপ্ততা কোনো দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল এক দুর্লভ আত্মমর্যাদা। তার সেই নীরবতা যেন উচ্চকণ্ঠের অপবাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ধরা দিয়েছিল। বিদায়বেলায় তিনি কোনো তিক্ততা সঙ্গে নিয়ে যাননি, বরং রেখে গেছেন এক অনুকরণীয় শিক্ষা যেখানে অহংবোধের চেয়ে দেশপ্রেম বড়, আর ব্যক্তিগত জয়ের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা করা বেশি জরুরি। দিনশেষে তার সেই হাসিমুখই হয়ে রইল তার শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদ।

এখন আমাদের হৃদয়কে স্বীকার করতে হবে আমরা যা দেখিয়েছি, তা শুধুই ন্যায্য সমালোচনা ছিল না। সেখানে ছিল অহংকার, অগভীরতা ও হীনম্মন্যতা। আমরা অল্পদৃষ্টিতে, সংক্ষিপ্তজ্ঞান ও ক্ষুদ্রমন্যতায় তার অবদানকে ছোট করতে চেয়েছি। আমরা হয়তো তার ধৈর্য, সংযম, নৈতিকদৃঢ়তা সবকিছুকে আমাদের ক্ষুদ্র রাগ ও স্বার্থপরতার চোখে বিচার করেছি। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, মহত্ত্বকে পরিমাপ করার মতো বিশালতা আমাদের হৃদয়ে ছিল না; বরং আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা দিয়েই তাকে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছি। আমাদের এই অগভীরতা, অহংকার ও ক্ষুদ্রতাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে, নিজেদের অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। ড. ইউনূস, ক্ষমা করবেন।

অবশ্য, ন্যায্যতার খাতিরে এটিও স্বীকার করতে হয় সমালোচনার সবটুকুই বিদ্বেষ ছিল না। পৃথিবীর কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, ডক্টর ইউনূসও নন। আমলাদের হাতে বন্দি হয়ে নির্বিচারে শত শত প্রমোশন দিয়েছেন কোনো পদ শূন্য না থাকার পরও।
সিদ্ধান্ত ও নিয়োগে আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে তিনি আরও সংবেদনশীল হতে পারতেন। উপদেষ্টা পরিষদের কিছু সদস্য প্রত্যাশিত কর্মদক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হলেও তাদের অপসারণে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা অনুপস্থিত ছিল, এমন অভিযোগও আছে। 

কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সময় তার নীরবতায়ও রাষ্ট্র ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনুপস্থিত সরকার হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক পর্যালোচনার অংশ, এগুলো উত্থাপন করা অপরাধ নয়। বরং এগুলোই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সুস্থ চর্চা। তবে পার্থক্য হলো নীতিগত বিশ্লেষণ আর ব্যক্তিগত আক্রমণের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

ড. ইউনূসের কর্ম ও জীবন কোনো একরৈখিক বৃত্তে সীমাবদ্ধ নয়। তার দীর্ঘ পথচলায় একদিকে যেমন রয়েছে প্রজ্ঞা ও সংযমের ঔজ্জ্বল্য, তেমনি সমালোচকদের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে তার প্রশাসনিক কঠোরতার এক ধরনের ঘাটতি। অনেকে এই কোমলতাকে তার নমনীয়তা হিসেবে দেখেন, আবার অনেকে একে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সীমাবদ্ধতা বলে মনে করেন। তবে একটি সত্য অনস্বীকার্য তিনি ক্ষমতাকে প্রতিক্রিয়াশীলতায় ব্যবহার করেননি। রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষে থেকেও অপমানের বিপরীতে তিনি রাষ্ট্রীয় শক্তির মহড়া দেননি কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষোভকে রাষ্ট্রীয়নীতিতে রূপান্তর করেননি। ক্ষমতার আস্বাদ পেয়েও তার এই নির্লিপ্তি এবং পরম সহিষ্ণুতা, তাকে সমসাময়িক অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

আমাদের ক্ষুদ্রতা, মজ্জাগত হীনম্মন্যতা আর অহংকারের দেয়াল আমাদের দৃষ্টিকে বারবার ঝাপসা করে দিয়েছে; আমরা আপনার বিশালতাকে ধারণ করতে পারিনি। হে বরেণ্য, আমাদের এই আত্মিক দৈন্য আর অগভীরতাকে আপনার বিশাল হৃদয়ের ক্ষমায় মার্জনা করবেন।

লেখক : গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


  বিষয়:   সম্পাদকীয়  ড. ইউনূস 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: