মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত রাশিয়ার জন্য একদিকে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, আবার অন্যদিকে কৌশলগত ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল সীমিত। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত শোকবার্তায় ঘটনাটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির লঙ্ঘন’ বলা হলেও কারও নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ স্পষ্ট করে বলেন, এটি রাশিয়ার যুদ্ধ নয় এবং মস্কো মূলত নিজেদের স্বার্থ রক্ষাতেই মনোযোগী। এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও বর্তমান সংঘাতে তেহরানের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে সতর্ক রাশিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন পুতিন। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের চাপের মধ্যে নতুন কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে চায় না মস্কো।
ইতোমধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সঙ্গে ফোনালাপে পুতিন সংঘাত কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এরপরই তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে উত্তেজনা প্রশমনের বার্তা দেয়।
গত কয়েক বছরে রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ বিমান এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি।
আরও পড়ুন
তবে সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি একটি রুশ নির্মিত ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমানও সহজেই ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েলের এফ৩৫ লাইটিং টু যুদ্ধবিমান।
এ অবস্থায় নতুন করে ইরানকে বড় ধরনের অস্ত্র সহায়তা দিতে চাইছে না মস্কো। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে উসকে দেওয়ার আশঙ্কা- দুই কারণেই রাশিয়া সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা লাভজনক। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতি রাশিয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কারণ দেশটির বাজেট পরিকল্পনায় তেলের দাম ধরা হয়েছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৫৯ ডলার।
তবে সামগ্রিকভাবে এই সংঘাত রাশিয়ার জন্য এক ধরনের কৌশলগত সংকেতও বয়ে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মস্কো তার মিত্রদের সরাসরি রক্ষা করতে কতটা সক্ষম- এই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
তবুও আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছকে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হিসেবেই দেখছে রাশিয়া। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা আদায় করাই এখন পুতিনের মূল কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এএডি/