ধান রোপণ শেষে শহরমুখী যাত্রা

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

ভোরের আলো ফুটতেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চর কাপাসিয়া থেকে রওনা দেন আবদুল হালিম। কাঁধে ছোট একটি ব্যাগ। ভেতরে দুই সেট কাপড়

2026-03-10T04:02:53+00:00
2026-03-10T04:02:53+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
ধান রোপণ শেষে শহরমুখী যাত্রা
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ৪:০২ এএম   (ভিজিট : ১৭৬)
বোরো ধান রোপণ শেষে কাজের সন্ধানে ঢাকায় ছুটছেন গাইবান্ধার শ্রমিকরা। ছবি : সময়ের আলো
ভোরের আলো ফুটতেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চর কাপাসিয়া থেকে রওনা দেন আবদুল হালিম। কাঁধে ছোট একটি ব্যাগ। ভেতরে দুই সেট কাপড় আর একটি গামছায় স্ত্রীর হাতে তৈরি করে দেওয়া শুকনো রুটি। বোরো ধানের চারা রোপণ শেষ। মাঠে এখন আর তার কাজ নেই। তাই আবারও রাজধানী ঢাকার পথে। ধান বড় হতে সময় লাগবে। এই ফাঁকে বসে থাকলে সংসার চলবে না, গাইবান্ধা বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে বলছিলেন তিনি।

উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধা মূলত কৃষিনির্ভর। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট আয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। বড় কোনো ভারী শিল্প-কারখানা নেই। কৃষি, গবাদিপশু পালন ও মৎস্য চাষই এখানকার মানুষের প্রধান ভরসা। জেলার অধিকাংশ জমি আবাদযোগ্য ধানের পাশাপাশি পাট, আখ, আলু ও শাকসবজি চাষ হয় বিস্তীর্ণ মাঠে।

বোরো মৌসুমে জমি তৈরি, চারা তোলা ও রোপণের সময় শ্রমের চাহিদা বাড়ে। তখন প্রতিদিনের মজুরি ৫০০-৬০০ টাকায় গড়ায়। কিন্তু রোপণ শেষ হলেই কাজ কমে যায়। মাঠে তখন শুধু সেচ আর অপেক্ষা। প্রায় দুই মাসের এই বিরতিতে দিনমজুররা পড়েন অনিশ্চয়তায়। 

ধান কাটার আগ পর্যন্ত তাদের অনেকেই কাজের খোঁজে পাড়ি জমান ঢাকায় কিংবা ভিন্ন জেলায়। হালিমের মতো আরও কয়েকজন শ্রমিক জানালেন, ঢাকায় গিয়ে তারা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কেউ রিকশা চালান, কেউ ইটভাটায়। দৈনিক আয় কিছুটা বেশি ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। তবে বাসা ভাড়া, খাবার আর যাতায়াত খরচ বাদ দিলে সঞ্চয় খুব বেশি থাকে না। তবু গ্রামে বসে থাকার চেয়ে শহরে যাওয়া তাদের কাছে ভালো বিকল্প।

গাইবান্ধার শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির। তিন দশকের বেশি সময় ধরে উল্লেখযোগ্য ভারী শিল্পায়ন হয়নি। সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও গ্যাস সংযোগ ও উন্নত অবকাঠামোর অভাবে সেটি প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। অনেক কারখানা আংশিক চালু, কিছু একেবারেই বন্ধ।

একসময় জেলার গর্ব ছিল গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকল। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলটি ছিল গাইবান্ধার একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয় হাজারো আখচাষি ও শ্রমিকের জীবিকা জড়িয়ে ছিল এর সঙ্গে। কিন্তু প্রায় ৫১৪ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে মিলটি বন্ধ রয়েছে। মূলত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মিলটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। চালুর দাবিতে কৃষক-শ্রমিকরা সোচ্চার হলেও মিলের চিমনিতে আর ধোঁয়া ওঠে না। চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর অনেক আখচাষি বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। কেউ জমি বর্গা দিয়েছেন। শ্রমিকদের একটি অংশও এখন মৌসুমি অভিবাসনের স্রোতে।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষিনির্ভর এই জেলায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, হিমাগার, দুগ্ধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা কিংবা পাটভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে সারা বছর কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের ঘাটতিতে তা এগোয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের ফাঁকেই তৈরি হয় কর্মসংস্থানের শূন্যতা। সদর উপজেলার গিদারী এলাকার রাশেদা বেগমের স্বামীও ঢাকায় গেছেন কাজের সন্ধানে। তিনি বলেন, বোরো লাগানো শেষ হইলেই ও যায়। বাচ্চাদের স্কুলের খরচ, ঘরের বাজার সব মিলায়া কষ্ট হয়। তায় কী আর করা? কাম নাই...।

এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়নকর্মী ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, মৌসুমি অভিবাসন কেবল দারিদ্র্যের লক্ষণ নয়, এটি কাঠামোগত কর্মসংস্থানের ঘাটতির প্রতিফলন।

উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী এম. আবদুস সালাম বলেন, উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি বেকারত্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যদি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সংরক্ষণাগার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা জোরদার না হয়, তা হলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই ঢাকামুখী হবেন। বেকারত্ব দূরীকরণে তরুণ-যুবদের কৃষি ও কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ জরুরি।

গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম বলেন, জেলার বেশিরভাগ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বছরের একটি বড় সময় তারা কাজের অভাবে বেকার থাকেন। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি এলাকায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। 

তার মতে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মহীন মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প স্থাপনে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলেও আশ্বাস দেন।

সবুজ বোরো ক্ষেত এখন বাতাসে দুলছে। কিন্তু সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা। ফসল বড় হওয়ার অপেক্ষায় মাঠ যেমন নীরব, তেমনি অপেক্ষায় থাকে শ্রমজীবী মানুষের পরিবারগুলো কবে শহর থেকে ফিরে আসবে তাদের প্রিয়জন, হাতে কিছু বাড়তি টাকা নিয়ে।

গাইবান্ধার বাস্তবতা যেন এই দুই চিত্রের মাঝামাঝি উর্বর জমি আর কর্মহীন মানুষের যাত্রা। কৃষির সম্ভাবনা আছে, আছে পরিশ্রমী মানুষও। কিন্তু শিল্পায়নের অভাব আর মৌসুমি কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা তাদের ঠেলে দেয় দূরের শহরে। সবুজ ক্ষেতের পাশে তাই প্রতি বছরই শুরু হয় ঢাকামুখী মানুষের আরেক যাত্রা। 

সময়ের আলো/এআর


  বিষয়:   ধান  রোপণ  শহরমুখী  যাত্রা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: