চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য আলোচিত। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৃহৎ পরিসরের যৌথ অভিযান এই এলাকাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিন হাজারের বেশি সদস্য, হেলিকপ্টার ও ড্রোনের সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
তবে অভিযানের পর উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা- সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী স্থানীয় তথ্য জাল। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী অভিযানটি ছিল গোপনীয়, কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের আগে থেকেই সন্ত্রাসীরা সম্ভাব্য তৎপরতার বিষয়ে কিছুটা ধারণা পেয়ে যায়। ফলে শীর্ষ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া সিসি ক্যামেরা, ডিভিআর এবং বাইনোকুলার থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল সন্ত্রাসীরা। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে তারা আশপাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির আগাম সংকেত পেত।
আরও পড়ুন
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও তাদের তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বা সন্দেহজনক চলাচলের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত, যা সন্ত্রাসীদের সতর্ক হতে সহায়তা করত।
তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ধরা না পড়লেও অভিযানে ২২ জনকে আটক করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দুর্বল করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এলাকাটিতে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন। অতীতে অভিযান শেষ হওয়ার পর বাহিনী চলে গেলে সন্ত্রাসীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠত। এবার সেই সুযোগ বন্ধ করতে প্রশাসন স্থায়ী উপস্থিতির উদ্যোগ নিয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের কারণে কিছু তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছাতে পারে। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন জানান, জঙ্গল সলিমপুরকে স্থায়ীভাবে সন্ত্রাসমুক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন স্থাপিত পুলিশ ক্যাম্পগুলো সেই পরিকল্পনার অংশ, যাতে অপরাধীরা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না পায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের প্রভাবের কারণে আতঙ্কে থাকতে হতো। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে তারা স্বস্তি অনুভব করছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু সামরিক বা পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আস্থা তৈরি এবং তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সলিমপুরের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
এএডি/