অ্যালগরিদমে চলছে যুদ্ধমেশিন

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে যুদ্ধের এক নতুন বাস্তবতা। তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত

2026-03-14T13:29:56+00:00
2026-03-14T13:31:56+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
অ্যালগরিদমে চলছে যুদ্ধমেশিন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ১:২৯ পিএম  আপডেট: ১৪.০৩.২০২৬ ১:৩১ পিএম
তেহরানে গতকাল কুদস দিবসের বিক্ষোভে এক নারী নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির পোস্টার ধরে আছেন। প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবারে ফিলিস্তিনপন্থি কর্মসূচি হিসেবে দিবসটি পালন করা হয়। ছবি : মিডল ইস্ট আই
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে যুদ্ধের এক নতুন বাস্তবতা। তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত যুদ্ধ। বোমারু বিমান, ড্রোন হামলা এবং লক্ষ্য নির্বাচন; সবকিছুই এখন ক্রমশ অ্যালগরিদমের কারণে দ্রুততর হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড দাবি করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলা এই যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে। তবে বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টাসেপ্টের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুদ্ধকে বদলে দিচ্ছে। ওই বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রযুক্তির এই নতুন ব্যবহার সংঘাতকে থামানোর বদলে আরও দ্রুত এবং আরও বিধ্বংসী করে তুলতে পারে। 

যুদ্ধের গতি বদলে দিচ্ছে প্রযুক্তি : যুদ্ধের ময়দানে সিদ্ধান্ত এক সময় নিত মানুষ। জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিংবা যুদ্ধবিমান চালানো পাইলটের ওপরই নির্ভর করত যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি। তবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সেই বাস্তবতা। এখন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, হামলার সময় নির্ধারণ করা, এমনকি কোথায় আঘাত করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে; এসব হিসাবও ক্রমশ করে দিচ্ছে অ্যালগরিদম। যুদ্ধের মেশিন যেন ধীরে ধীরে মানুষের হাত ছেড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তীব্র উদাহরণগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যাপক নজরদারি তথ্য, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধের গতি অনেক দ্রুত হয়ে উঠেছে; কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানবিক বিবেচনার সংকট। 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় প্রায় চার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছিল। 

অনুসন্ধানী সাংবাদিক নিক টার্স দ্য ইন্টারসেপ্টকে বলেন, আধুনিক যুদ্ধের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আকাশ থেকে অবিরাম হামলা। তার মতে, সাম্প্রতিক অভিযানে আক্রমণের তীব্রতা এত বেশি যে এটি অতীতের অনেক সামরিক অভিযানের তুলনায় অনেক দ্রুতগতির। এই হামলার কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘নিরবচ্ছিন্ন আকাশযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ আকাশ থেকে একের পর এক আঘাত করে প্রতিপক্ষের অবকাঠামো দ্রুত ধ্বংস করা। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ভূমিকা : এই যুদ্ধকে আলাদা করে তুলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার। সামরিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্য নির্বাচন, নজরদারি এবং হামলার সময় নির্ধারণে এখন অ্যালগরিদমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। 

প্রযুক্তি সাংবাদিক স্যাম বিডল দ্য ইন্টারসেপ্টকে বলেন, আকাশযুদ্ধে নিরীহ মানুষের মৃত্যু আগে থেকেই একটি বড় সমস্যা ছিল। কিন্তু যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে হামলার গতি আরও বাড়ানো হয়, তখন ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ঝুঁকিও বাড়ে। তার ভাষ্য- দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অ্যালগরিদম ব্যবহার করলে ‘হত্যার গতি’ বেড়ে যায়। ফলে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সম্ভাবনাও অনেক বেশি হয়ে ওঠে। 

উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় বলা হয়, ইরানের ভেতরে বহু বিমান হামলা এমন গতিতে চালানো হয়েছে যে একই দিনে শতাধিক স্থানে আঘাত করা হয়েছে। ইন্টারসেপ্টের পডকাস্টে বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই ‘মেশিন-গতির যুদ্ধ’ পরিস্থিতিতে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন প্রায় শিল্প-কারখানার উৎপাদনের মতো দ্রুত হয়ে যায়। অ্যালগরিদমের তৈরি তালিকায় থাকা অনেক স্থাপনাই পরে বেসামরিক অবকাঠামোর খুব কাছাকাছি বলে দেখা গেছে; যেমন আবাসিক এলাকা, কর্মস্থল বা স্থানীয় অবকাঠামো। ফলে বিস্ফোরণের অভিঘাতে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। 

যুদ্ধের মানবিক মূল্য : যুদ্ধের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি রয়েছে মানবিক বিপর্যয়। বোমাবর্ষণ এবং সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলে সাধারণ মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ নিরাপদ জায়গায় যেতে যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক আকাশযুদ্ধ প্রায়ই শহর ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের পরিকল্পনা যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, বাস্তবে তার প্রধান শিকার হয় সাধারণ মানুষ। এই বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

সংঘাতের বিস্তার নিয়ে আশঙ্কা : বিশ্লেষকরা আরও একটি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন; এই সংঘাত কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বহু বছর ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জটিল। ফলে একটি সংঘাত দ্রুত বড় আকার ধারণ করার ঝুঁকি সবসময় থাকে। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অস্ত্র প্রতিযোগিতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর হয়ে উঠছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সামরিক কৌশলে অ্যালগরিদম ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের গবেষণা শুরু করেছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতাকে অনেক বিশ্লেষক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ বলে উল্লেখ করেন। এতে বিভিন্ন দেশ প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য দ্রুত নতুন সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করার চেষ্টা করে। এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের যুদ্ধকে আরও দ্রুত এবং আরও অপ্রত্যাশিত করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা। 

ইন্টারসেপ্টের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়। তা হলো- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না, কিন্তু এটি লক্ষ্য নির্ধারণের সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করে এবং সেই তালিকা এত বড় ও দ্রুত তৈরি হয় যে মানুষ অনেক সময় শুধু অনুমোদন দেওয়ার ভূমিকায় নেমে আসে। এতে যুদ্ধের নৈতিক ও মানবিক যাচাই প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। পডকাস্টে বিশ্লেষকরা বলেন, আধুনিক আকাশযুদ্ধে আগে থেকেই বেসামরিক প্রাণহানির সমস্যা ছিল, কিন্তু অ্যালগরিদম ব্যবহার করে হামলার গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলে সেই ঝুঁকিও বাড়ে। কারণ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত তখন মানুষের ধীর বিচার নয় বরং ডেটা বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য তালিকা তৈরির গতির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। তাদের মতে, এটাই আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা; যেখানে যুদ্ধের মেশিন ক্রমশ অ্যালগরিদমের গতিতে চলতে শুরু করেছে, আর সেই গতি অনেক সময় মানুষের জীবন রক্ষার বিবেচনাকে পেছনে ফেলে দেয়। 

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ : বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র যেমন একসময় যুদ্ধের ভারসাম্য পাল্টে দিয়েছিল, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ভবিষ্যতের সংঘাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; কিন্তু এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিই মূল বিষয়। যদি দ্রুততর হামলা যুদ্ধকে আরও অমানবিক করে তোলে, তা হলে ভবিষ্যতের সংঘাত হতে পারে আরও ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ এক অর্থে ভবিষ্যতের যুদ্ধের পূর্বাভাসও হতে পারে। যেখানে সৈন্যের পাশাপাশি কাজ করবে অ্যালগরিদম, ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তব্যবস্থা। 

অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব : যুদ্ধ কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই সেখানে সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা গেছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ে। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। 


ইরাকে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত উপসাগরজুড়ে নতুন হামলা 
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত। ইরানে টানা হামলার ১৪ দিনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছে ১৮ হাজারের বেশি মানুষ। যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ইরাকে মার্কিন সামরিক বিমানের বিধ্বস্ত হওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায়। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৬ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের আকাশে একাধিক ড্রোন ও লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীও জানিয়েছেন, শিগগিরই তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার হামলা চালানো হতে পারে। 

এই সংঘাতে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহল। লেবাননে চলমান হামলার মধ্যেই দেশটির জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস। 

শুরু থেকেই তীব্র হামলা, বহু বেসামরিক হতাহত : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরুর মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে একযোগে হামলা চালানো হয় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ১৪ দিনে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫১ জন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইরানের পাল্টা হামলা : ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে। ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একইসঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। আলজাজিরার শুক্রবারের লাইভ আপডেটে বলা হয়, ইরান নতুন দফায় ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। 

ইরানের সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ ইসরায়েলের বিরশেবা অঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ধরে এমন হামলা অব্যাহত থাকবে এবং ইসরায়েলের আরও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। 

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, একটি ক্ষেপণাস্ত্র নাজারেথের কাছে জারজির গ্রামে আঘাত হানে। এতে অন্তত ৩৩ জন আহত হয়। বিস্ফোরণে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায় এবং আশপাশের যানবাহনে আগুন ধরে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ মানুষ উড়ে আসা কাচের টুকরোর আঘাতে আহত হয়েছে। ইসরায়েলের জরুরি সেবা সংস্থা ম্যাজেন ডেভিড অ্যাডম জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে বহু মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের বেশিরভাগের আঘাত সামান্য। 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জরুরি সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং এলাকা দ্রুত নিরাপদ করার চেষ্টা চলছে। 

ইরাকে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত : যুদ্ধ চলাকালে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে ইরাকে। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এতে চারজন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও দুজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে বিমানটি কোনো শত্রু বা মিত্রপক্ষের হামলায় ভূপাতিত হয়নি। দুর্ঘটনার কারণ এখনও তদন্ত করা হচ্ছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, এ দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আরও একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান উড়ছিল। 

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিস্ফোরণ ও ড্রোন হামলা : যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলেও। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে শক্তিশালী কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের পর শহরের আকাশে ঘন ধোঁয়ার মেঘ দেখা যায় এবং বেশ কিছু ভবন কেঁপে ওঠে। দুবাই সরকারের গণমাধ্যম দফতর জানায়, আকাশে একটি লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ একটি ভবনের সামনে পড়ে। এতে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিস্ফোরণের পর মধ্যাঞ্চলের আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা এক দিনেই ৫৬টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ড্রোন তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৩টি ড্রোন ও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। 

ওমানে ড্রোন বিধ্বস্ত : সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ওমানেও। বিবিসির খবরে বলা হয়, ওমানের সোহারের আল-আওয়াহি শিল্প এলাকায় একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে দুই বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। ওমান নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, একই এলাকায় আরেকটি ড্রোন একটি খোলা জায়গায় পড়ে যায়। তবে সেই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। দেশটির কর্তৃপক্ষ এখন এই দুটি ঘটনার তদন্ত করছে। 

লেবাননে হামলা ও জাতিসংঘের উদ্বেগ : এই সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে লেবাননে। ইসরায়েল গত ২ মার্চ থেকে দেশটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮৭ জন নিহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লেবাননের রাজধানী বৈরুত সফর করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, লেবাননের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্যই তিনি সেখানে গেছেন। তিনি আরও বলেন, লেবাননের জনগণ এই যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু তাদের এতে টেনে আনা হয়েছে। জাতিসংঘ এই অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাবে। 

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন হুমকি : যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক আঘাত হানা হতে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হুরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সামরিক সুরক্ষা দেবে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ইতিমধ্যে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন। 

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এখন পর্যন্ত ইরানের প্রায় ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই হামলার মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, শিগগিরই তেহরানসহ ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাত্রার হামলা দেখা যেতে পারে। 

যুদ্ধের বিরোধিতায় মার্কিন সংস্থাগুলো : যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিরোধিতা বাড়ছে। দুই শতাধিক মার্কিন সংগঠন কংগ্রেসে চিঠি দিয়ে এই যুদ্ধে অর্থায়ন বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাত থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের কো-প্রেসিডেন্ট রবার্ট ওয়েইসম্যান বলেন, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার। তার মতে, এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষাধিক দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। 

ইরানে কুদস দিবসে গণমিছিল : যুদ্ধের মধ্যেই ইরানে পালিত হয়েছে আল-কুদস দিবস। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজানের শেষ শুক্রবার ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, তাবরিজ, কোম ও অন্যান্য শহরে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষদের হাতে ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকা দেখা যায় এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে নানা স্লোগান দেওয়া হয়। অনেকের হাতে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি এবং নিহত নেতা আয়াতুল্লাহ আলিীখামেনির ছবিও ছিল। 

বিক্ষোভ দমনের হুমকি : এদিকে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস নতুন করে বিক্ষোভ দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাহিনীটি বলেছে, সরকারবিরোধী নতুন কোনো বিক্ষোভ হলে তা আরও কঠোরভাবে দমন করা হবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ইরানে হওয়া বিক্ষোভে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। ইরান সরকার ওই বিক্ষোভের জন্য বিদেশি শক্তিকে দায়ী করেছিল, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতেই বহু মানুষ মারা যায়। 

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক কর্মসূচি স্থগিত : মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ডি-৮ জোটের শীর্ষ সম্মেলন। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে। 

হুরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা : বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের অনুমতি পাওয়ার পর তুরস্কের মালিকানাধীন একটি জাহাজ ওই প্রণালি পার হয়েছে। তিনি বলেন, ওই এলাকায় তুরস্কের মালিকানাধীন আরও ১৫টি জাহাজ রয়েছে, যেগুলো প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে এবং এ বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। 

যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে ইরান, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যে কোনো সময় আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে; এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। 

যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প 
ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসের অন্দরেই প্রবল টানাপড়েন শুরু হয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কখন ও কীভাবে যুদ্ধে নিজেদের জয়ী ঘোষণা করা হবে, তা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিভাজন। উপদেষ্টাদের এই অভ্যন্তরীণ ‘দড়ি টানাটানি’র প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরস্পরবিরোধী প্রকাশ্য বক্তব্যে। কর্মকর্তা ও উপদেষ্টাদের একাংশ ট্রাম্পকে সতর্ক করছেন, ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার কারণে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। এর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক মাশুল গুনতে হতে পারে ট্রাম্পকে। 

অন্যদিকে কিছু কট্টরপন্থি নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলা অব্যাহত রাখতে চাপ দিচ্ছেন। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা ও এসব আলোচনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার থেকে এ তথ্য জানতে পেরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। হোয়াইট হাউসের অন্দরের এই অচলাবস্থার ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক অভিযানের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। 

বারবার বার্তা বদল, অন্দরমহলে নানা দৃষ্টিভঙ্গি : গত বছর ক্ষমতায় ফেরার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ‘গর্দভের মতো’ কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ করবেন না। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে পরিস্থিতি বদলেছে। গত দু-সপ্তাহে এই যুদ্ধের জেরে টালমাটাল আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার, ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি বাণিজ্য। ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণের এই প্রতিযোগিতা তার শাসনামলের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। তবে এবার এর ফলাফল বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে যুদ্ধ ও শান্তির ভাগ্য নির্ধারণ করছে। 

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছিলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন ট্রাম্প। এখন তার দাবি, এই হামলা আদতে একটি ‘সীমিত অভিযান’ এবং এর সিংহভাগ উদ্দেশ্যই পূরণ হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই বার্তা অনেকের কাছেই এখনও অস্পষ্ট। বিশেষ করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরস্পরবিরোধী মন্তব্যে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বুধবার কেন্টাকিতে একটি নির্বাচনি ধাঁচের সভায় ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আমরা যুদ্ধে জিতে গিয়েছি।’ পরক্ষণেই আবার অবস্থান বদলে তিনি বলেন, ‘আমরা কি সময়ের আগে চলে আসতে চাই? না, আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।’ 

ট্রেজারি বিভাগ ও ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। তাদের আশঙ্কা, তেলের বাজারে বড়সড় ধাক্কা লাগলে এবং জ্বালানির দাম বাড়লে যুদ্ধের পক্ষে দেশের ভেতরে জনসমর্থন দ্রুত কমতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপদেষ্টাসহ আরও দুই সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। সূত্রমতে, একই সুর শোনা গেছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের কথায়ও। চিফ অভ স্টাফ সুজি ওয়াইলস ও ডেপুটি চিফ জেমস ব্লেয়াররা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। তারা ট্রাম্পকে পরামর্শ দিচ্ছেন, জয়ের সংজ্ঞাকে যেন অকারণ দীর্ঘায়িত না করে একে ‘সীমিত অভিযান’ হিসেবে তুলে ধরে দ্রুত কাজ শেষ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। 

অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, টম কটন ও সংবাদ ভাষ্যকার মার্ক লেভিনের মতো কট্টরপন্থিরা চাইছেন ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় থাকুক। তাদের যুক্তি, ইরানকে যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে হবে। পাশাপাশি মার্কিন সেনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলারও কড়া জবাব দিতে হবে। 

তৃতীয় আরেকটি পক্ষ হলো ট্রাম্পের জনতুষ্টিবাদী সমর্থক গোষ্ঠী এবং কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন ও ডানপন্থি টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসনের মতো ব্যক্তিরা। তারা চাইছেন না আমেরিকা আবার মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। তারা এই বিষয়ে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি করছেন। 

ট্রাম্পের ওই উপদেষ্টা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে একসঙ্গে সব পক্ষকে খুশি রাখতে চাইছেন। ‘তিনি কট্টরপন্থিদের বোঝাচ্ছেন অভিযান চলছে, বাজারকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, আর নিজের সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন যে এই সংঘাত আর বাড়বে না।’ মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই কাহিনি কিছু বেনামি সূত্র, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো আলোচনাতেই উপস্থিত থাকেন না, তাদের গুজব ও জল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট একজন ভালো শ্রোতা এবং অনেকের মতামত নেন- এটি সবারই জানা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার যে শেষপর্যন্ত তারই হাতে এবং নিজের বার্তার সেরা বাহক তিনি নিজেই, তা সবারই জানা। প্রেসিডেন্টের পুরো টিম এখন ‘পারেশন এপিক ফিউরি-র লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জনের জন্য একাগ্র হয়ে কাজ করছে।’ এই আলোচনায় যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিরা রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেননি। 

যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন ট্রাম্প : ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পেছনে জোরালো কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনো সম্ভাব্য ইরানি হামলা রোখা, কখনো দেশটির পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া, কখনো বা তেহরানের সরকার পরিবর্তন- বারেবারে বদলেছে হোয়াইট হাউসের যুদ্ধের লক্ষ্য। কিন্তু এখন এক অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। কিছু সমালোচকের মতে, ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলার পরেও দমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই ইরানের। 

শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা যুদ্ধ শুরুর আগেই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, গোড়ায় তা কানে তোলেননি ট্রাম্প। তবে চলতি সপ্তাহে টালমাটাল বাজারকে আশ^স্ত করতে এবং তেল-গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছেন তিনি। খুব সম্ভব এর নেপথ্যে রয়েছেন তার শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুদ্ধের অভিঘাতকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। একে স্রেফ ‘সাময়িক অভিযান’ বলে বর্ণনা করে তিনি দাবি করেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। মূলত এক অনিশ্চিত যুদ্ধের আতঙ্ক কাটাতেই তার এই মরিয়া চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। 

সূত্রের খবর, কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন, সামরিকভাবে অন্তত একে ‘বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করে যুদ্ধের ইতি টানতে। তাদের পরামর্শ, হামলায় টার্গেট করা ইরানের অধিকাংশ নেতৃত্ব এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ যদি টিকে থাকেও, তবু যেন তিনি একে সাফল্য হিসেবে প্রচার করেন। 

আমেরিকা ও ইসরায়েলের দফায় দফায় হামলায় ইরানে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রথম সারির ইরানি নেতাকে। এমনকি লেবাননের মতো দূরবর্তী স্থানেও হামলা চলেছে। ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডার গুঁড়িয়ে দেওয়া, প্রায় সম্পূর্ণ নৌবাহিনীর ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা খর্ব করার মতো সাফল্য দাবি করছে আমেরিকা। কিন্তু এই তথাকথিত সামরিক সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ ও অবকাঠামোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলায়। এর জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। 

ট্রাম্পের দাবি, এই যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন। যদিও প্রাথমিক ঘোষণায় চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। তবে তার উপদেষ্টাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। 

যুদ্ধ এখন ছড়িয়ে পড়েছে অন্তত আধডজন দেশে। এই যুদ্ধ শুরু করার তার কারণগুলো বারেবারে বদলে যাওয়ায় আগামী দিনে কী ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে ধন্ধ বাড়ছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানও নিজেদের জয়ী হিসেবেই দাবি করবেন। কারণ আমেরিকা-ইসরাইলের প্রবল আক্রমণ সামলে তারা শুধু টিকেই থাকেনি, বরং পাল্টা আঘাত হেনে ইসরাইল ও আমেরিকার মিত্রদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি করতে পেরেছে। 

সময়ের আলো/এনএ 


  বিষয়:   অ্যালগরিদমে চলছে  যুদ্ধমেশিন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: