ঈদের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস প্রদান নিয়ে দুরকম তথ্য মিলছে। শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এখনও অর্ধেক গার্মেন্টস শিল্পে বোনাস প্রদান করা হয়নি। আর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ইতিমধ্যেই ৯৬ শতাংশ কারখানায় বোনাস প্রদান করা হয়েছে। অবশ্য শ্রমিক নেতারা বলছেন, এখনও ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া হয়নি।
শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এক-চতুর্থাংশ শিল্প-কারখানায় গত ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এখন পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে। এখনও শ্রমিকের ঈদ বোনাস পরিশোধ করেনি অর্ধেক শিল্প-কারখানা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১০ হাজার ১০০ শিল্প-কারখানা শিল্প পুলিশের তদারকির মধ্যে রয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ২ হাজার ৫৪৪ কারখানা গত মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেনি। এ ছাড়া ৪৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭টি কারখানা এখনও ঈদ বোনাস দেয়নি।
চলতি মাসের শুরুতে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দেশের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ৯ মার্চ ও ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এমনকি সচল ও রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিক-কর্মচারীদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
এ ছাড়া চলতি মাসে রফতানিমুখী শিল্প খাতের বকেয়া ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছাড় করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপরও প্রতি বছর মতো এবারও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতার দাবিতে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের কিছু মালিক ইচ্ছা করেই ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও বোনাস দেরিতে দিচ্ছেন। কারণ আগে বেতন-বোনাস দিলে শ্রমিকরা চলতি মাসের বেতনের একটি অংশ চাইবেন। অথচ কিছু কারখানা ইতিমধ্যে ফেব্রুয়ারির বেতন-বোনাস ও চলতি মার্চের ১০ দিনের বেতন দিয়েছে।
গাজীপুরের এইচডিএফ অ্যাপারেলসের শতাধিক শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ অনিশ্চিত। কারণ কারখানার মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানার বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরে নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর তিনজন নেতা কারখানাটিকে ৩০ লাখ টাকা ঋণ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য সচল কারখানা ২ হাজার ১২৭ (ঢাকা ও চট্টগ্রাম)। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ২ হাজার ৯০টি ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দিয়েছে। তার মানে বেতন পরিশোধ বাকি আছে ৩৭ কারখানায়। আর ঈদ বোনাস দিয়েছে ২ হাজার ৫১টি, অর্থাৎ এখনও বোনাস দেয়নি ৭৬ কারখানা। এ ছাড়া জানুয়ারি মাসের বেতন বাকি আছে ৫ কারখানায়। মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন দিয়েছে ৪৭৮ শিল্প-কারখানা।
বিজিএমইএ জানায়, মঙ্গলবার ৩৫ শতাংশ বা ৬২৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। আজ ৪৫ শতাংশ বা ৮০৩টি কারখানায় ছুটি হবে। বৃহস্পতিবার ছুটি হবে ৮৯টি কারখানার।
এদিকে বিজিএমইএর তথ্য বলছে, ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধের সর্বশেষ পরিস্থিতি ইতিবাচক। চলতি বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোনের মোট দুই হাজার ১২৭টি সচল কারখানার মধ্যে দুই হাজার ৫১টি বা ৯৬.৪৩ শতাংশ কারখানা এরই মধ্যে শ্রমিকদের ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে।
এতে বেশিরভাগ শ্রমিক উৎসবের আগে তাদের প্রাপ্য ভাতা হাতে পেয়েছেন। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির বেতন প্রায় শতভাগ কারখানায় (৯৯.৯৫ শতাংশ) পরিশোধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির বেতন ৯৮.২৬ শতাংশ বা দুই হাজার ৯০টি কারখানায় পরিশোধ করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন নিয়ে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতার শঙ্কা নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ঈদ সামনে রেখে তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের কাজ শেষ পর্যায়ে। সামগ্রিকভাবে তেমন কোনো অনিশ্চয়তাও নেই। তিনি বলেন, শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে নাড়ির টানে নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন এবং ছুটি শেষে আবার কর্মস্থলে ফিরে আসবেন এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, কিছু ঠিকা বা সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানা রয়েছে, যেগুলো বিজিএমইএর সদস্য নয়। এসব কারখানার শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা জোনে মোট এক হাজার ৭৮৫টি সচল কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭৮৪টি কারখানায় জানুয়ারি মাসের বেতন এবং এক হাজার ৭৫৬টি কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে এই জোনে এক হাজার ৭২৪টি কারখানা (৯৬.৫৮ শতাংশ) শ্রমিকদের বোনাস প্রদান করেছে।
ফলে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের অগ্রগতি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩৪২টি সচল কারখানার সব কটিতেই জানুয়ারির বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩৪টি কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৩২৭টি কারখানায় (৯৫.৬১ শতাংশ) ঈদ বোনাস প্রদান করা হয়েছে। কয়েকটি কারখানায় বোনাস পরিশোধ বাকি থাকলেও দ্রুত তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঈদের আনন্দ আরও বাড়াতে বেশ কিছু কারখানা শ্রমিকদের মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সার্বিকভাবে ৪৭৮টি কারখানা বা ২২.৪৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এই অগ্রিম বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জোনে ২৫.৬৬ শতাংশ কারখানা অগ্রিম বেতন দেবে, চট্টগ্রাম জোনে এই হার ৫.৮৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের সম্ভাব্য যাতায়াতের একটি রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বেতন ও বোনাস পাওয়ার পর ধাপে ধাপে শ্রমিকরা রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল ছাড়বেন। ১৬ মার্চ প্রায় ১৫ শতাংশ বা ২১৮টি কারখানার শ্রমিক ঢাকা ছাড়বেন; ১৭ মার্চ প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ৬২৫টি কারখানার শ্রমিক যাত্রা করবেন; ১৮ মার্চ সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ বা ৮০৩টি কারখানার শ্রমিক ঢাকা ত্যাগ করবেন; ১৯ মার্চ অবশিষ্ট ৫ শতাংশ বা ৮৯টি কারখানার শ্রমিক ঢাকা ছাড়বেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে শ্রম প্রশাসন, শিল্প পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত তদারকি করছে। যেসব কারখানায় এখনও পাওনা বাকি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত পরিশোধের জন্য মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের আলো/এআর