কী অভিযোগ আনা হয়েছে জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে

2026-09-18T22:00:06+00:00
2026-09-18T22:00:06+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
কী অভিযোগ আনা হয়েছে জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০০ পিএম 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল ও লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। সংগৃহীত ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগ দাখিলের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় উসকানি, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এবং অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ।

তাদের বক্তব্য, আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে— এটি যেমন সত্য, তেমনি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আগে যথাযথ ও সতর্ক তদন্তও প্রয়োজন। ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করেন।

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় এই আটজনের বিরুদ্ধে উসকানি, ষড়যন্ত্র এবং প্ররোচনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।  

কী অভিযোগ আনা হয়েছে?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহতদের ওপর হামলার ঘটনায় আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার আগের রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্যের কথা হয়েছিল। একই সময়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, যেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ বলা হয়েছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করছে।

এছাড়া ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় দুজন নিহত হওয়ার ঘটনাও অভিযোগের আওতায় রয়েছে।

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিমের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের গুলিতে ওই দুজন নিহত হন। ১৮ ও ১৯ জুলাই একই এলাকায় আরও কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনাও অভিযোগের অংশ।

প্রসিকিউশনের দাবি, ৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন দমনে যেসব রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অভিযুক্তরা সেগুলো সমর্থন করেছিলেন এবং ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন।

তবে প্রসিকিউটর নিজেই জানিয়েছেন, আটজনের সবার ভূমিকা এক ধরনের নয়। তার ভাষায়, কেউ টকশো করেছেন, কেউ ফোনে কথা বলেছেন এবং কেউ বক্তৃতা বা বিবৃতি দিয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হচ্ছে?

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিমের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে শুধু সরাসরি রাস্তায় গিয়ে কাউকে গুলি করে হত্যা করাকেই বোঝায় না। কোনো সরকারের নীতি বা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একমত হয়ে পরামর্শ দেওয়া কিংবা ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়াও অপরাধের অংশ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

প্রসিকিউশনের আরও দাবি, অভিযুক্তদের কয়েকজন পেশাজীবী হলেও তারা তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে মানুষের কাছে বৈধ হিসেবে তুলে ধরতে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক মাকসুদ কামালের বক্তব্য জানতে তাদের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

কারা আসামি?

এই মামলায় জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামাল ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, মাজহারুল কবির শয়ন এবং তানভীর হাসান সৈকতকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা পলাতক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তদন্ত নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে?

মামলার তদন্ত ও অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বিচার শুরুর আগেই প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার কাজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, অনেক ঘটনার সত্যতা থাকলেও তার সঙ্গে অসত্য তথ্য যুক্ত হলে প্রকৃত সত্যও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগের পাশাপাশি ৫ আগস্ট এবং এর পরবর্তী সময়ে সংঘটিত নির্যাতন ও মব সহিংসতার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও সতর্কতার সঙ্গে তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই, এমন কাউকে এসব মামলায় যুক্ত করা উচিত নয়।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম অবশ্য দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়ায় অতীতে যেসব আপত্তি উঠেছিল, আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেগুলো দূর করা হয়েছে। তার দাবি, বর্তমানে বিচার আন্তর্জাতিক আইনের অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে।

মৃত্যুদণ্ড এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার বা ‘ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়া’ নিয়েও তিনি যুক্তি দিয়েছেন। তার বক্তব্য, বাংলাদেশের মতো দেশে মৃত্যুদণ্ড না থাকা বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে, অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থেকে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিলে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করার সুযোগ না থাকলে অনেক মামলার বিচার শেষ করা সম্ভব হবে না।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অতীতেও সমালোচনা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ জানিয়েছে।

গত ২৮ জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তবে প্রসিকিউশন বলছে, বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।

এই মামলায় জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। অভিযোগ আনা হয়েছে মানেই আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   মানবতাবিরোধী অপরাধ  জাফর ইকবাল  মাকসুদ কামাল 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: