তেল আবিবে গুচ্ছ বোমা হামলা, হুরমুজে মার্কিন বাংকার বাস্টার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি ও বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এবার ফিলিস্তিনের গোয়েন্দা মন্ত্রীকে

2026-03-19T02:46:28+00:00
2026-03-19T02:48:52+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
তেল আবিবে গুচ্ছ বোমা হামলা, হুরমুজে মার্কিন বাংকার বাস্টার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ২:৪৬ এএম  আপডেট: ১৯.০৩.২০২৬ ২:৪৮ এএম  (ভিজিট : ৯৩)
সংগৃহীত ছবি
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি ও বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এবার ফিলিস্তিনের গোয়েন্দা মন্ত্রীকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। এই পরিস্থিতি সংঘাতের বিস্তারকে আরও গভীর করে তুলেছে। প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে তেল আবিবে গুচ্ছ বোমা হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে কমপক্ষে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হুরমুজের কাছে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে বাংকার বাস্টার বোমা হামলার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের স্থাপনায় তেল আবিবের হামলার খবর মিলেছে। এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনার খবর সামনে এসেছে; যা যুদ্ধকে কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়, অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।

নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ও বাসিজ কমান্ডার সোলাইমানির মৃত্যু নিশ্চিত করল ইরান : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার ১৮তম দিনে এসে সংঘাতের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি হয়, যখন দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। যুদ্ধের শুরুতেই, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন; এই তথ্য আগেই সামনে এসেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে লারিজানির মৃত্যু ছিল এক ধরনের ধারাবাহিক আঘাত, যা ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, সোমবার রাতে চালানো ইসরাইলি হামলায় শুধু লারিজানিই নন, তার ছেলে এবং ডেপুটি আলিরেজা বায়াতও নিহত হয়েছেন। এই তথ্যটি ইঙ্গিত দেয় যে হামলাটি ছিল অত্যন্ত লক্ষ্যভিত্তিক এবং উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। একই সঙ্গে বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে আইআরজিসি। 

তাকে ‘গৌরবময় সেনাপতি’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়, তিনি ‘আমেরিকান-জায়নিস্ট শত্রুদের’ হামলায় নিহত হয়েছেন। এই ধরনের ভাষা ব্যবহার ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও কাজ করে, যেখানে নিহতদের ‘শহিদ’ হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং প্রতিশোধের মনোভাব জোরদার করা হয়।

ইসরাইলে ক্লাস্টার বোমা হামলা ইরানের : লারিজানির মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে, যার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তেল আবিবে ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ সমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি যুদ্ধের চরিত্রকে আরও জটিল করে তোলে, কারণ ক্লাস্টার বোমা মাঝআকাশে বিস্ফোরিত হয়ে অসংখ্য ছোট ছোট বিস্ফোরকে বিভক্ত হয় এবং বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এগুলো প্রতিরোধ করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হয়ে যায় এবং বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে জনবহুল তেল আবিবে চালানো এই হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। যদিও এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তবু হামলার ধরন এবং লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরাইলের দাবি, ইরান এই যুদ্ধে বারবার ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করছে। 

এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তা হলে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধ আইন নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, কারণ এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ওপর বহু দেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই হামলা শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং একটি বার্তা। ইরান দেখাতে চাচ্ছে যে তারা সরাসরি ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

ইসরাইলের শতাধিক স্থানে হামলা, ৫ বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইরানের : ইরানের প্রতিশোধমূলক অভিযানের পরবর্তী ধাপ আরও বিস্তৃত আকার নেয়। আইআরজিসি জানায়, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’-এর ৬১তম ধাপে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলাগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে খোররামশাহর-৪, গদর, এমাদ এবং খেইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র; যেগুলো ইরানের দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। 

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ইসরাইলের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই কঠিন, তবু তেল আবিবে আংশিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং উদ্ধার তৎপরতায় ব্যাঘাত ঘটার তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ইরান এখন ইসরাইলের বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করছে। পাঁচটি প্রধান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র : ওরোট রবিন, রুটেনবার্গ, হাগিত, এশকোল ও হারুভিতকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো মিলিয়ে দেশের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

যদি এই কেন্দ্রগুলোতে সফল হামলা হয়, তা হলে তা কেবল সামরিক নয়, বেসামরিক জীবন, শিল্প উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধটি ধীরে ধীরে অবকাঠামো-নির্ভর ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

লারিজানির পর ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রীকে হত্যার দাবি ইসরাইলের : লারিজানি ও সোলাইমানির মৃত্যুর পরপরই ইসরাইল ফিলিস্তিনের গোয়েন্দা মন্ত্রীর ওপর নজর দেয় ইসরাইল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ দাবি করেছেন, ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব নিহত হয়েছেন। 

তিনি বলেন, রাতে চালানো এক ইসরাইলি হামলায় খতিব নিহত হন। তবে এ বিষয়ে এখনও ইরানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবু এটি ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সম্ভাব্য নতুন ফ্রন্ট খুলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার দাবির ফলে সংঘাত আরও বৈশ্বিক এবং বহুপক্ষীয় রূপ নিতে পারে, যা শুধু ইরান বা ইসরাইল সীমিত রাখবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়াবে।

ইরানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের স্থাপনায় ইসরাইলের হামলা : ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে গতকাল বুধবার ভোরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে। 

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানায়, হামায় স্থাপনাটিতে আগুন ধরে গেছে এবং উদ্ধারকারী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে রয়েছেন। উল্লেখ্য, ইরানের সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। যেখানে ইরান ও কাতার উভয় দেশের গ্যাস উত্তোলন-বিষয়ক স্থাপনা রয়েছে।

এদিকে ইসরাইলের সংবাদমাধ্যমগুলো স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে দেশটির গ্যাস অবকাঠামোতে এই হামলা চালিয়েছে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে ‘বাংকার বাস্টার’ হামলার দাবি : গত বছরের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়েও সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা হয়েছিল। ইসরাইলের ওই হামলার পর গ্যাসক্ষেত্রটির উৎপাদন আংশিকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যখন ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তখন যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, হুরমুজ প্রণালির কাছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর ‘বাংকার বাস্টার’ হামলা চালানো হয়েছে।

এই হামলায় ৫ হাজার পাউন্ডের ‘ডিপ পেনিট্রেটর’ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভূগর্ভস্থ বা শক্তভাবে সুরক্ষিত স্থাপনাকে ধ্বংস করার জন্য তৈরি। এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের অর্থ হলো, লক্ষ্যবস্তু ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তভাবে সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনা। 

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই ঘাঁটিগুলোতে থাকা অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছিল। বিশেষ করে হুরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হওয়ায় এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে এবং সংঘাতকে আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ দিচ্ছে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   তেল  আবিব  বোমা  হামলা  হুরমুজ  মার্কিন  বাংকার  বাস্টার 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: