ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দ্রুত জটিল ও বিস্তৃত আকার নিচ্ছে, যেখানে একই সঙ্গে সামরিক হামলা, কূটনৈতিক টানাপড়েন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সামনে আসছে। একদিকে ইরান ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে ইরানে টানা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা বিমান অভিযানে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে।
একই সময়ে বিশ্বনেতাদের সরাসরি যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, হুরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় সংকেত হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি এবং বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
ইসরাইলি হামলায় তাদের নিহত হওয়ার দাবি সামনে আসে এবং ইরানের ভেতরে এটিকে সরাসরি ‘লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখা হয়। এই ঘটনা শুধু সামরিক নয়, প্রতীকী দিক থেকেও বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়, কারণ লারিজানি ছিলেন নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। এর ফলে দ্রুত প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।
এই ঘটনার পরপরই ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে। তেল আবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। বিশেষ করে ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে, কারণ এই ধরনের অস্ত্র বিস্তৃত এলাকায় ক্ষতি করে এবং বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বাড়ায়। হামলার পর বিভিন্ন জায়গায় আগুন, ধ্বংসস্তূপ এবং আতঙ্কের দৃশ্য সামনে আসে।
একই সময় ইরান হামলার গতি ও মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ১০ ঘণ্টারও কম সময়ে সাত দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে ডিমোনা ও তেল আবিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরও ছিল। এই ধারাবাহিক আক্রমণ ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইসরাইলও দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। ইসরাইলি বিমানবাহিনী ইরানের ভেতরে ৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় বলে জানানো হয়। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ইরানে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যা সংঘাতের তীব্রতা কতটা বেড়েছে তা বোঝায়।
এর মধ্যে ইরান তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে। দেশটির সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয়, ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয় না আসা পর্যন্ত’ যুদ্ধ চলবে। এই বক্তব্য কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও যে তারা কোনো দ্রুত সমঝোতার পথে যাচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।
একই সময়ে বিশ্বনেতাদের সরাসরি যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, হুরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় সংকেত হয়ে উঠেছে।
পূর্ণাঙ্গ বিজয় পর্যন্ত লড়াই চালানোর ঘোষণা ইরানের : ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয় না আসা পর্যন্ত’ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম-আল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেড কোয়ার্টার্সের কর্মকর্তা আলি আবদুল্লাহি আলিয়াবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ইরানের অখণ্ডতা রক্ষায় তাদের বাহিনী ‘গর্বিত, বিজয়ী এবং অবিচল’।
তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। তবে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত।
১০ ঘণ্টায় ৭ দফা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরান ১০ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইসরাইলে সাত দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেল আবিব ও ডিমোনা শহর লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়। হামলার পর ভিডিও ফুটেজে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, আগুন এবং কালো ধোঁয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
পাল্টা জবাবে ইসরাইলি বিমানবাহিনী ইরানের ভেতরে ৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ইরানে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের নতুন নিরাপত্তা প্রধান : ইসরাইলি হামলায় নিহত আলি লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতবা খামেনির অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আদেশে এই নিয়োগ কার্যকর হয়। জোলঘাদর এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এবং আইআরজিসির কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এই নিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরাইলে ৪ হাজার ৮২৯ জন আহত : ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে ৪ হাজার ৮২৯ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১১ জন এখনও হাসপাতালে ভর্তি এবং ১২ জনের অবস্থা গুরুতর। এই পরিসংখ্যান সংঘাতের মানবিক প্রভাব ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট করে তুলে ধরছে।
বিশ্বনেতাদের প্রতি নেতানিয়াহুর আহ্বান : ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বনেতাদের এই যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরান কেবল ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
হুরমুজ প্রণালি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ইরান পুরো বিশ্বকে বিপন্ন করে তুলছে।’ তার মতে, এখন সময় এসেছে অন্যান্য দেশকে সরাসরি যুক্ত হওয়ার।
ইরানে হামলার তীব্রতা বাড়বে : ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ জানিয়েছেন, এ সপ্তাহে ইরানে হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে ইরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’
হামলার সব দায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ওপর চাপালেন ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব প্রথম দিয়েছিলেন তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি জানান, ইরান দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসে মদদ দিচ্ছে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’।
জ্বালানিতে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে অচল করার হুমকি আইআরজিসির : ইরানের ইসফাহানে গ্যাস স্থাপনা ও পাইপলাইন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে আইআরজিসির কর্মকর্তা মহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোয় হামলা চালালে তারা মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেবে। এই হুমকি উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ অবসানে বৈঠকের আয়োজনে প্রস্তুত পাকিস্তান : পাকিস্তান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চাইলে তারা আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে সংলাপই একমাত্র পথ। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠকের আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যদিও এখনও তা নিশ্চিত হয়নি।
যুদ্ধ থেকে ফিরে যাচ্ছে বৃহত্তম মার্কিন রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড : মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ গ্রিসে ফিরে গেছে। প্রযুক্তিগত সমস্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে এই রণতরীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
ঐকমত্যের দাবি ট্রাম্পের, তেহরান বলল মিথ্যা কথা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং আলোচনা চলছে। তবে ইরান এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এই দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এসব বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সময়ের আলো/আরবিএন