আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ৫৫ বছর আগে এই মাহেন্দ্রক্ষণেই বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘোষণা ধ্বনিত হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এদিনে। আজকের এই গৌরবোজ্জ্বল দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই সব শহিদকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির যে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল তা ছিল দীর্ঘ দুই দশকের বঞ্চনার কড়া জবাব। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছিষট্টির ছয়দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনের গণরায়ের পথ ধরেই এসেছিল আমাদের স্বাধীনতা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন ২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই ডাকে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। কোনো বাধা মানেনি বাঙালিরা। স্বাধীনতার আহ্বান যেন সবার মনে এক নতুন দিনের জন্ম দেয়।
স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ রুখবে তাদের কারা, এই প্রত্যয় যেন মুক্তিপাগল সবার চোখে-মুখে। তবে কবির মুখে উচ্চারণ হয়েছিল, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা, শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো দানবের মতো চিৎকার করতে করতে (শামসুর রাহমান)।
স্বাধীনতার স্বাদ পেতে পুরো বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণে লড়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে। আবালবৃদ্ধবনিতারা দলবদ্ধভাবে একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে দলে দলে যোগদান শুরু করে। পরাধীনতার গ্লানি মুছতে দীর্ঘদিন যাবৎ বাঙালিরা সংগ্রাম করে আসছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছে। আবার অকাতরে নিজেরা প্রাণ দিয়েছেন। শুধু স্বাধীনতার জন্য। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশের সম্পদ লুটে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। বৈষম্যের শিকার হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর মানুষ।
যে দেশের পাট ছিল বিশ্বখ্যাত। সেই পাটের মুনাফা চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করার এক দীর্ঘ পরিকল্পনা শুরু হয়। এই পরিকল্পনায় দেশের আপামর মানুষ উপলব্ধি করতে পারে। মুষ্টিবদ্ধ হাতে শপথ নেয়, বঞ্চনার শিকল ছিঁড়তে হবে। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথ চলা শুরু হয়।
স্বাধীনতা শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা ছিল না। এই স্বাধীনতা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। গোলামের জিঞ্জির থেকে মুক্তি পাওয়া। যে কারণে কবি বলে উঠেছেন, ‘স্বাধীনতা তুমি শহীদ মিনারের অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা/ স্বাধীনতা তুমি পতাকাশোভিত সেøাগানমুখর ঝাঁঝালো মিছিল। ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি’ (শামসুর রাহমান)। এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, স্বাধীনতা একক কোনো মানুষের চাওয়া-পাওয়া ছিল না। এ ছিল সম্মিলিত আপামর মানুষের।
স্বাধীনতা দিবসে আমাদের শপথ হোক হিংসা-ভেদাভেদ ভুলে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন দেশ গড়া। একাত্তরের পথ ধরে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এসেছিল। তাই প্রতিটি শহিদের প্রতি রইল অশেষ বিনীত শ্রদ্ধা।
সময়ের আলো/আআ