রাত গভীর। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টিতে ডুবে আছে ঢাকার কংক্রিটের জঙ্গল। জানালায় বৃষ্টির ছাঁট, মেঘের গর্জন- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভয়ের আবহ। পুরোনো পারিবারিক লাইব্রেরিতে বসে আছে রুমা। টিমটিমে মোমবাতির আলোয় তার সামনে রাখা কাঁসার বাক্সটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাক্সটি তার দাদু, মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আহমেদের। মৃত্যুর আগে তিনি কেবল বলেছিলেন, ‘সময় থমকে গেলে এই বাক্সটা খুলিস।’ আজ দেশের উত্তাল পরিস্থিতিতে রুমার মনে হলো- সময় সত্যিই থেমে গেছে।
তালা ভাঙতেই ভারী হয়ে উঠল ঘরের বাতাস। ভেতরে সোনা-দানা নেই- কিছু পুরোনো চিঠি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোপন ম্যাপ, একাত্তরের ছবি, একটি রক্তমাখা কমান্ডো নাইফ। আর নিচে লাল কাপড়ে মোড়ানো এক অদ্ভুত কালো পাথর। পাথর ছুঁতেই শরীরে শক খেল রুমা। চারপাশ গলে যেতে লাগল। অদৃশ্য ঘূর্ণিতে সে হারিয়ে গেল।
চোখ খুলে সে বুঝল- সে আর লাইব্রেরিতে নেই। কর্দমাক্ত ধানক্ষেত, পোড়া বারুদের গন্ধ, দূরে জ্বলছে গ্রাম। শকুন ঘুরছে আকাশে। ‘কে ওখানে?’- চিৎকার।
ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকজন সশস্ত্র যুবক। তাদের নেতা আনিস, এক তরুণ গেরিলা কমান্ডার। সন্দেহের চোখে জিগ্যেস করল, ‘রাজাকারদের চর?’ রুমা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি... আমার দাদু ইশতিয়াক আহমেদ...’ তার হাতে থাকা পাথর দেখে আনিস স্তব্ধ। এটা ইশতিয়াকের! সে বলত এটা ‘কালভৈরব’- সময়ের চাবি।
রুমা বুঝল- সে ১৯৭১ সালে এসে পড়েছে।
আরও পড়ুন
আনিস তাকে নিয়ে গেল গোপন ক্যাম্পে- একটি পরিত্যক্ত স্কুলঘর। সেখানে যুদ্ধের বাস্তবতা- আহতদের আর্তনাদ, ওষুধের অভাব, ছেঁড়া কাপড়ে ব্যান্ডেজ, আর একপাশে অপারেশন পরিকল্পনা। স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠ ভেসে আসছে। রুমা ধীরে ধীরে মিশে গেল তাদের সঙ্গে। রান্না করে, সেবা করে, গল্প শুনে। বুঝল- এই যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের নয়, ন্যায়বিচারের। একদিন খবর এলো পাকিস্তানি বাহিনীর বিশাল কনভয় ব্রিজ পেরিয়ে শহরে ঢুকবে। সেটি থামাতে না পারলে সর্বনাশ। বিস্ফোরক নেই পর্যাপ্ত।
রুমা বলল, ‘গ্রেনেড দিয়ে পিলার উড়িয়ে দেওয়া যায়।’ আনিস তার কথায় বিশ্বাস করল। অন্ধকার রাতে তারা ব্রিজের নিচে পৌঁছাল। হঠাৎ সার্চলাইট, তারপর গুলির ঝড়। দুজন সঙ্গী নিহত। আনিস আহত। ‘ফিউজ জ্বালাও!’- চিৎকার করল সে। রুমা পাথর আঁকড়ে ধরে আগুন দিল। বিকট বিস্ফোরণে ব্রিজ ভেঙে পড়ল কনভয়সহ। আগুনে আকাশ লাল। আনিস বলল, ‘এই পাথর এখানে রাখা যাবে না। ফিরে যাও। বলো- আমরা হারিনি।’
পাথর তীব্র কাঁপতে লাগল। আবার ঘূর্ণি। সব অন্ধকার। রুমা ফিরে এলো লাইব্রেরিতে। সময় এখন ২০২৪। পাথরটি নিস্তেজ, কয়লার মতো। কিন্তু বাইরে বৃষ্টির শব্দ নয়- টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড। টিভিতে দেখল ঢাকা রণক্ষেত্র। ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। রুমার মনে পড়ল আনিসের কথা। সে বুঝল একাত্তর শেষ হয়নি। সে দাদুর রক্তমাখা পতাকা বের করল। কপালে বাঁধল। পাথরটি পকেটে রেখে রাস্তায় নেমে পড়ল।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশৃঙ্খলা। গুলি, ধোঁয়া, আতঙ্ক। তার সামনে এক কিশোর লুটিয়ে পড়ল- একাত্তরের দৃশ্য যেন ফিরে এলো। কিন্তু এবার সে ভাঙল না। রুমা ছাত্রদের সংগঠিত করল। ব্যারিকেড তৈরি, টিয়ারশেল মোকাবিলা- সব শেখাতে লাগল। তার কণ্ঠে উঠল স্লোগান, যা হয়ে উঠল ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। ‘আমরা একা নই,’ সে বলল, ‘ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মা আমাদের সঙ্গে।’
আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। কারফিউ ভেঙে মানুষ নামল রাস্তায়। এই প্রজন্মের চোখেও একই আগুন। অবশেষে পতন ঘটল স্বৈরশাসনের। ৫ আগস্ট জনতার বিজয়। বিজয়ের দিন রুমা গেল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে সে পাথরটি পুঁতে দিল। ‘ঋণ শোধ হবে না,’ সে বলল, কিন্তু স্বাধীনতা আমরা আর হারাতে দেব না। পাথরটি মাটিতে মিশে গেল।
রুমা অনুভব করল- জাদু পাথরে নয়, মানুষের সাহসে। গোধূলির আকাশে লাল আভা। নতুন প্রজন্ম শপথ নিচ্ছে। রুমা জানে এই লড়াই শেষ নয়। কারণ তারা সেই উত্তরাধিকার বহন করে, যারা রক্ত দেয়, কিন্তু মাথা নত করে না।
এএডি/