লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের অন্তত ১০ জন রয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম।
জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন হাওড় অঞ্চলের অনেক যুবকের। তবে সেই প্রবাস পাড়ি দেওয়ার পথটি ইতিমধ্যে অনেকেই দালালের মাধ্যমে বেঁচে নিচ্ছেন। ফলে উন্নত জীবন তো দূরের কথা, সেই প্রবাসে যেতে গিয়ে কেউ মাফিয়া চক্রের পাল্লায় পড়েছেন, কেউবা কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন আবার কেউবা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছেন সমুদ্রের গভীর নোনা জলে।
এই যেমন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল গনি। ৩ ছেলে ৪ মেয়েকে নিয়ে সাজানো সংসার। তবে গণির ছোট ছেলের বায়না পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দূর প্রবাসে পাড়ি দিবে। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ বাবা ঝণ করে ১২ লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে দালালের মাধ্যমে গ্রিসে পাঠালেও সেই ছেলের মৃত্যুর হয় সমুদ্রের মধ্যে। সেই শোকে কাতর হয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে বাড়ি সামনে বসে কাঁদছেন বৃদ্ধ বাবা।
আব্দুল গনি জানান, জায়গা বিক্রি করে টাকা দিলাম। দালালকে অনেক অনুরোধ করলাম ছেলে যেন ভালো মতে পৌঁছে কিন্তু সেটা আর হল না। এখন একটাই চাওয়া শেষবারের মতো ছেলের নিথর দেহটা দেখতে চাই।
একই গ্রামের আরও দুই যুবক কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারি ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২)-সহ একই উপজেলার ৫ যুবকের মৃত্যু হয়।
মূলত অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরের পথ ভুলে খাবার আর বিশুদ্ধ পানির অভাবে একে একে মৃত্যু হয় সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের ৫, জগন্নাথপুরে ৪ ও দোয়ারা বাজার ১ জনসহ তিন উপজেলার ১০ যুবকের। আর এতে পুরো সুনামগঞ্জে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
দিরাইয়ের নিহতের মামা আরশাদ বলেন, সংসারের হাল ধরতে দালালের মাধ্যমে আমার বাগনে গ্রিসের পথে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। গ্রিসে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলো।
নিহত মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না আত্মীয় রাহুল মিয়া বলেন, দালাকে ১২ টাকা ঋণ করে দিয়ে আমাদের সন্তানদের মরতে হলো। আমরা এখন কী নিয়ে বাঁচব। দালালদের সর্বচ্চ শাস্তি চাই।
এদিকে দিরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার সময়ের আলোকে জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ভয়াবহ মানবপাচারের নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দালাল চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে।
স্বজনদের অভিযোগ, বিল্লাল মূলত গ্রিসে অবস্থান করে সেখান থেকে দালালি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন। আর দেশে থেকে তার ভাই দুলাল মিয়া সহজ-সরল যুবকদের ইউরোপের প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেন। মূলত এই দুই ভাইয়ের গড়ে তোলা ‘মরণফাঁদেই’ পা দিয়েছিলেন আমিনুর ও শায়করা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন আমিনুর। দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১১ লাখ টাকা চুক্তিতে তিনি এই বিপদসংকুল পথ বেছে নেন। তবে ৩ দিনের মধ্যে গ্রিস পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও দালাল চক্র তাকে দীর্ঘ ৩ মাস লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখে। এর মধ্যে এক মাস তাকে রাখা হয়েছিল কুখ্যাত ‘গেমঘরে’। সেখানে তাকে খাবার না দিয়ে উপোস রাখা হতো এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের শ্যালক জাহিদুর রহমান জাহিদ।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া সময়ের আলোকে জানান, বিষয়টি দুঃখ জনক। যারা অবৈধ ভাবে গ্রিস যেতে চেয়েছিল তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। পরর্বতী নির্দেশনা চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ বিষয়ে নির্দেশনা পেলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবও।
গ্রিক কোস্ট গার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ৬ দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়।
পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝ সমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। জগন্নাথপুরের এই পাঁচ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং এই আন্তর্জাতিক দালাল সিন্ডিকেটের হোতা দুলাল ও বিল্লালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
এফআর