মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যে ধোঁয়া, সেটি শুধু বোমার না। এটি একটি সভ্যতার পচন ধরার গন্ধ। একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর দম্ভ, অন্যদিকে হাজার বছরের পাহাড়ি দুর্গম ভূখণ্ডে টিকে থাকা এক জাতির অটল মনোবল। এই দুইয়ের মুখোমুখি লড়াইয়ে ইতিহাস কার পক্ষে যাবে, সেটি নিয়ে বিশ্লেষকরা এখন শুধু আঙুল গোনেন।
খারগ দ্বীপে যদি আমেরিকা দুই হাজার কমান্ডো নিয়ে স্থল অভিযানে নামে, তা হলে সেটি হবে ভিয়েতনামের চেয়েও ভয়াবহ একটি ফাঁদে স্বেচ্ছায় পা দেওয়া। ভিয়েতনামে অন্তত জঙ্গল ছিল সমতলের কাছাকাছি। এখানে আছে দুর্গম পাহাড়, ভূগর্ভস্থ টানেলের জাল, লক্ষাধিক প্রশিক্ষিত সেনা আর ড্রোনের এক বিশাল ঝাঁক যেটি আধুনিক যুদ্ধের সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। এটি শুধু কৌশলগত ভুল হবে না, এটি হবে একটি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনের মহড়া।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমেরিকা কি এই বাস্তবতা বোঝে না? অবশ্যই বোঝে। কিন্তু সমস্যা হলো, ভেতরের রাজনীতি বাইরের যুদ্ধের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে সিদ্ধান্তগুলোকে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধ শেষ করতে চান, কিন্তু ইসরাইলি নেতৃত্বের চাপ তাকে সেই পথ থেকে বারবার সরিয়ে দিচ্ছে। এটি আজকের কথা নয়। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ওপর ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে এবং বর্তমান প্রশাসনে সেই প্রভাব পারিবারিক বন্ধন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ওয়াশিংটনের কোনো সিদ্ধান্ত তেল আবিবের অনুমোদন ছাড়া চূড়ান্ত হয় না, এটি কূটনৈতিক মহলে এখন প্রায় খোলা রহস্য।
ভূমধ্যসাগর থেকে যেদিন আমেরিকার দৈত্যাকৃতির বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড ফোর্ড এবং আব্রাহাম লিংকন সরিয়ে নেওয়া হয়, সেদিনই মূলত মনোবলের যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি, কিন্তু প্রতীকী শক্তির দিক থেকে সেটি ছিল পিছু হটার স্বীকৃতি। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহর যখন অবস্থান বদলায়, তখন বাকি দুনিয়া সেটি লক্ষ্য করে এবং পক্ষ-বিপক্ষ নতুন করে মাপে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর দূরপাল্লার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিছক প্রতীকী কিছু ছিল না। তেল আবিবে সেই আঘাত জানান দিয়েছে যে প্রতিরোধের শৃঙ্খল এখনও অটুট। এটি আগে থেকে পরিকল্পিত একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ সুনির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি কৌশলগত ভুল ছিল ইরানের গোয়েন্দা প্রধান আলি লারিজানিকে হত্যা করা। কাশেম সুলাইমানির পর লারিজানি ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি একাধারে দক্ষ সমরবিদ এবং কার্যকর কূটনীতিক ছিলেন। যুদ্ধ এবং সংলাপ, দুটো ভাষাতেই যিনি সমান দক্ষতায় কথা বলতে পারতেন। তাকে সরিয়ে দেওয়া মানে শান্তিচুক্তির সম্ভাব্য পথটিও বন্ধ করে দেওয়া।
এখন ইরানের ভেতরে যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছেন, তারা অনেক বেশি কঠোর, অনেক কম নমনীয়। ফলে আলোচনার টেবিলে বসার মতো কোনো মুখ এখন সামনে নেই।
তা হলে ইরানের ভেতরে এখন আসলে কী ঘটছে? উত্তরটা অস্বস্তিকর। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মৃত্যুর পর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ নিচের দিকে নেমে এসেছে। তরুণ সেনা অফিসাররা, যারা বছরের পর বছর রক্ত ঝরিয়েছেন এবং সহযোদ্ধাদের কবরে শুইয়েছেন, তারা এখন কোনো আপস মেনে নিতে রাজি নন। যদি সিনিয়র জেনারেলরা আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যান, তা হলে ভেতর থেকেই তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। ইতিহাসের ভাষায় বলতে গেলে, এটি সিপাহি বিদ্রোহের আধুনিক সংস্করণ। রাজনীতি এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরে এই উত্তেজনা ইরানকে বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের চাপে ফেলতে পারে।
আর এই পুরো সংঘাতে সবচেয়ে নীরবে লাভবান হচ্ছে ইরান নিজেই। হুরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত তাদের হাতে। কোন জাহাজ যাবে, কোনটা যাবে না, এই সিদ্ধান্ত প্রতিদিন তেহরানে নেওয়া হচ্ছে। এর বিনিময়ে প্রতিদিন আসছে প্রায় একশ কোটি ডলার। যুদ্ধের মাঝেও যে দেশ এভাবে আয় করতে পারে, তার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙা এত সহজ নয়।
অন্যদিকে স্কুলে হামলা চালিয়ে দুইশ শিশুকে হত্যার ঘটনাটি যে মানসিকভাবে ইরানকে ভেঙে দেবে বলে ভাবা হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ উল্টো ফল দিয়েছে। পুরো জাতি এক হয়ে গেছে। যে সমাজে আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছিল, সেখানে এখন একটাই কণ্ঠস্বর। বাইরের আক্রমণ যা পারেনি, ভেতরের ক্ষোভ তাই পেরেছে, তবে বিপরীত দিকে।
ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্বের স্বপ্ন একটি বৃহত্তর ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের। লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, গাজার পর ইরান, এই ধারাবাহিক পরিকল্পনার বাস্তবতা এখন সংকুচিত হয়ে আসছে। কারণ ইরান ওই দেশগুলোর মতো নয়। এখানে ভূগোল, জনশক্তি, প্রযুক্তি এবং মনোবল সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি হয়েছে যেটি অতিক্রম করা কাগজে-কলমের হিসাবের চেয়ে বাস্তবে অনেক কঠিন।আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার ভেতরে এই যুদ্ধের মাশুল কে দেবেন, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। সাধারণ আমেরিকান নাগরিক আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নিজের ছেলেকে পাঠাতে রাজি নন। এই জনমত উপেক্ষা করে কতদিন চলা যায়, সেটি রাজনীতির পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত দুটো পথ খোলা আছে। হয় স্থল আক্রমণ করে নিজেদের সামরিক কবর খোঁড়া অথবা এই অঞ্চলে ইরানকে একটি অপরাজেয় শক্তি হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া। ইতিহাস সাক্ষী, যে সাম্রাজ্য নিজের সীমানা বোঝে না, সে শুধু অন্যের ভূখণ্ড নয়, নিজের ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলে।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
এফআর