একসময় সমুদ্র মানেই ছিল নীল জল, অফুরন্ত প্রাণ আর আশার প্রতীক। আজ সেই সমুদ্রের দিকে তাকালে চোখে পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের মোড়ক। নদী, খাল, হাওড় হয়ে সেই প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমছে সাগরে।
আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি, এগুলো আলাদা করে ফেলা কিছু আবর্জনা মাত্র। কিন্তু সত্যি কথা হলো— এই প্লাস্টিক শুধু পরিবেশকে নষ্ট করছে না, ধীরে ধীরে আমাদের ভবিষ্যৎকেও গ্রাস করছে।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হয়। এর প্রায় ৮৫ শতাংশই একবার ব্যবহার করে ফেলা হয়। অর্থাৎ, শুধু একবার ব্যবহার করার জন্যই তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক। দক্ষিণ বা পূর্ব এশিয়ার বাজারে আমরা দেখি রোদ্দুর নামলেই পণ্যের প্যাকেট, পানি, শীতল পানির বোতল, সবখানে প্লাস্টিক।
সামান্য খেতে খেতে প্লাস্টিক জমে যায় আমাদের চারদিক। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়।, এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রগুলোতে মাছের চেয়েও বেশি প্লাস্টিক ভাসবে, যদি আমরা একই রেটেই পলিউশন চালাই।
সমুদ্রজীবীরা ভুলে বোঝে প্লাস্টিককে খাবার। কচ্ছপ, মাছ, ডলফিন অনেকে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে, পরে প্রাণ হারায়। আর যারা জানে এটি খাদ্য নয়, তারা ফাঁদে পড়ার পর মারা যায়। বিশ্ব সংরক্ষণ সংস্থা ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ জানিয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায় প্লাস্টিকের কারণে।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমরা প্রতিদিন প্রায় ঐচ্ছিকভাবে ১৭৫ মাইক্রোগ্রাম প্লাস্টিক খাচ্ছি, যা প্রায় একটি ক্রেডিট কার্ডের ওজনের সমান। এই পরিমাণ প্লাস্টিক আমাদের কোষের মধ্যে জ্বালাপোড়ার মতো ক্ষতি করতে পারে আর গবেষণা এখনও বলছে এটি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে নদী, খাল আর কৃষিজমি সব জায়গায় প্লাস্টিক দেখা যায়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা রাজশাহী শহরে একবার ফেলা প্লাস্টিক খুব দ্রুত নদী বা খালে পৌঁছে যায়, কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এখনও তেমন উন্নত নয়।
প্লাস্টিকের মূল সমস্যা পরিবেশ ক্ষতি নয়; সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের স্বাস্থ্য।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বা রাসায়নিক লিকেজ বিভিন্ন উপায়ে শরীরে প্রবেশ করলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, পাচনতন্ত্রে সমস্যা হতে পারে, দীর্ঘ সময় ইন্ট্রাকশন হলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে, শিশু ও গর্ভবতী নারীর জন্য বড় ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এই মুহূর্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে জানাশোনা এখনও চলমান, কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রাথমিক গবেষণা নির্দেশ করে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রশ্নটা করা জরুরি মানুষ কেন প্লাস্টিক ব্যবহার করে? কারণ, এটি সস্তা, শক্তপোক্ত এবং পানি ও দাগ প্রতিরোধী, প্যাকেজিংয়ের জন্য সহজ কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে এমন কিছু বিপদ যুক্ত হয়েছে, যেটি আর সীমাবদ্ধ রাখা যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন আসে : আমাদের কি এখনও সময় আছে? উত্তর হলো : হ্যাঁ, কিন্তু খুব কম সময় বাকি আছে।
শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা কঠিন। কিন্তু আমাদের যেটুকু সময় আছে, সেটা কাজে লাগাতে হবে। ব্যবহারই কমাতে হবে বিশেষত একবার ব্যবহার করা প্লাস্টিক। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ, বোতল, কন্টেইনার এগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্লাস্টিক সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়ায় দেওয়া। কিন্তু বাংলা দেশেও এই প্রক্রিয়াটি এখনও অপর্যাপ্ত।
একটি কার্যকর নীতিমালা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। সরকারি মানদণ্ড, কঠোর আইন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শহর পরিষ্কার করার আধুনিক পদ্ধতি এসব বাধ্যতামূলক।
যেমন— মালয়েশিয়া, জার্মানি বা জাপানে প্যাকেজিং/প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে শহরগুলো পরিষ্কার রাখা হয়েছে। আমাদের দেশেও উল্লেখযোগ্য জেলা, কয়েকটি থানা, বাজার সম্প্রদায়ের উদ্যোগে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করার সফল উদাহরণ পাওয়া গেছে। কিন্তু এটিকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে কার্যকর সমন্বয় দরকার।
সব কিছু সরকারি হাতে ছেড়ে দিলে হবে না। প্রতিটি নাগরিকের কিছু ভূমিকা আছে : বাজারে প্লাস্টিক ব্যাগ না নেওয়া, মাইক্রোফাইবার জামাকাপড় থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র প্লাস্টিক সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সামাজিকমাধ্যম ও জনসাধারণের আলোচনায় পরিবেশ রক্ষায় অংশগ্রহণ। এগুলো ছোট পদক্ষেপ মনে হলেও একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্লাস্টিক সমস্যার অর্থনৈতিক প্রভাবও ভয়ানক। নৌপথ আটকে গেলে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যটন শিল্প, বিশেষত সমুদ্রসৈকত মানহানির মুখে পড়ে। কয়েকটি গবেষণা দেখিয়েছে, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে সামুদ্রিক জীবজগৎ থেকে প্রাপ্ত উপাদানের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমে যাবে।
প্লাস্টিকের ভয়াবহতা নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু চাইলে আমরা ফেরাতে পারি পৃথিবীর কিছু অংশকে। প্লাস্টিক সমস্যার মোকাবিলা সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন, সচেতন নাগরিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির সমন্বয়ে সম্ভব।
আমাদের ভবিষ্যৎ শুধু একটি প্রশ্ন নয়— এটি একটি ডাক যে আমরা কি পরিবর্তন আনতে চাই? পৃথিবী কি একটি নীল, জীবমণ্ডলাচ্ছন্ন বস্তু থাকবে, নাকি আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিকে ভরা পৃথিবীতে বসবাস করব? উত্তরটা আমরা আজকের কাজেই পাব।
লেখক : শিক্ষার্থী, নীলফামারী সরকারি কলেজ, নীলফামারী।
এফআর