মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত জটিল হয়ে ওঠা যুদ্ধ পরিস্থিতির ভেতরেই নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের গভীর অবিশ্বাস, অন্যদিকে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা— এই বাস্তবতায় ইসলামাবাদ নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে সংঘাত যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সেই প্রচেষ্টা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে— পাকিস্তান কি সত্যিই শান্তি আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারবে, নাকি ব্যর্থ হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে ইসলামাবাদ থেকে সাংবাদিক সাঈদ শাহ লিখেছেন, ইরানে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বোমাবর্ষণ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো পাকিস্তানের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার আয়োজনের আশার ওপর গভীর ছায়া ফেলছে। পাকিস্তান এক ধরনের সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কূটনীতি চালাচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে নিজেদের তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আলোচনার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দিতে চাইছে ইসলামাবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সরাসরি কোনো পক্ষ না হওয়া এবং দেশে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকায়, অন্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মতো অতিরিক্ত রাজনৈতিক বোঝাও তাদের নেই।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের কার্যত শীর্ষ নেতা, সেনাপ্রধান ফিল্ড আসিম মুনিরে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজিত এক সমাবেশে হুথি সমর্থকরা অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে। একই সময় হুথি বাহিনী ইসরাইলের সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরান-ইসরাইল সংঘাতে যুক্ত হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, নীতিগতভাবে উভয়পক্ষই আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রবল এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের অবস্থানের মধ্যে ফারাক অনেক।
তাদের মতে, সম্ভাব্য আলোচনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো— ইসরাইল এই প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে পারে।
শুক্রবার ইসরাইল ইরানের দুটি বড় ইস্পাত কারখানা ও বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আগারচি বলেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা সাময়িক বন্ধ রাখার ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরান আরও জানায়, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ও এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করেন, এই ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা-ই আলোচনার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালেহা লোদি বলেন, ইরানের প্রধান উদ্বেগ হলো— যুদ্ধের সমাপ্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের কোনো হামলা না হওয়া।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস করা। তিনি যুক্তিসংগত খেলোয়াড় নন, বরং সম্পূর্ণ অনির্দেশ্য।’
ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান চুক্তি করতে ‘খুবই আগ্রহী’, তবে তেহরান বলছে, তিনি ‘নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছেন’।
তবে ইরান শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। একটি প্রস্তাব হলো— হুরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রফতানির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও এই প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও ট্রাম্প নিজে এই প্রণালির যৌথ নিয়ন্ত্রণের ধারণা দিয়েছেন।
এ পর্যন্ত পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করেছে, যেখানে উভয়ই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, আন্তরিকতা থাকলে এই দূরত্ব কমানো সম্ভব।
শনিবার পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ফোন করেন। একই সঙ্গে তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠকে বসার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই চার দেশ মুসলিম বিশ্বে নতুন এক সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে— যেখানে রয়েছে বড় সামরিক শক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক প্রভাব। তবে সৌদি আরবের কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন, তারা ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকুক— এমনটিই চান।
ইসলামাবাদ আশা করছে, সম্ভাব্য আলোচনা সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষভাবে হবে— যেখানে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলাদা কক্ষে থাকা মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন। তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসতে রাজি নয়।
পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং তাদের বড় সেনাবাহিনী আলোচনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের বিমানবাহিনী ইরানি প্রতিনিধিদের নিরাপদে আনতে সহায়তা করতে পারে।
ইরান অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্রতারণার চেষ্টা করছে, গত এক বছরে আলোচনার মধ্যেই দুবার হামলার উদাহরণ তুলে ধরে তারা এই দাবি করছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বৃদ্ধি শান্তি আলোচনার ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, পেন্টাগন অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে, যা ইতিমধ্যে পাঠানো ৭ হাজার সেনার সঙ্গে যুক্ত হবে।
ভ্যান্স এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার বেশিরভাগ সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, তবে ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে’ অভিযান কিছুটা সময় চালিয়ে যাওয়া হবে।
পাকিস্তানের জন্য এই শান্তি প্রচেষ্টার পেছনে আরও একটি জরুরি কারণ রয়েছে। গত বছর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার ফলে প্রয়োজনে রিয়াদের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী থাকার কারণে পাকিস্তান এমন পরিস্থিতি এড়াতে চায়।
এফআর