কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের পিএমখালী রেঞ্জের খুরুশকুল এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। প্রতি রাতে ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাটি। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়খেকোরা নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে বেশ কয়েকটি পাহাড় ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আরও বেশ কয়েকটি পাহাড় ও টিলা হারিয়ে যাওয়ার পথে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার পাশাপাশি বনভূমি দখলের মহোৎসবেও মেতেছে পাহাড়খেকোরা।
অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে তারা পাহাড়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। এভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন খুরুশকুলবাসী।
পাহাড় কাটা বন্ধের দাবিতে পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন স্থানীয়রা। কিন্তু তারপরও টনক নড়েনি বন বিভাগের। তাদের অভিযোগ, খুরুশকুল বনবিট কর্মকর্তা ঘুষ নিয়ে পাহাড় কাটা বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে ঘুষ নেওয়ার তথ্য সত্য নয় বলে দাবি করেন খুরুশকুল বনবিট কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন। তার কথায়, আমি এখানে আসার পর থেকেই পাহাড় কাটা বন্ধের চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু পাহাড়খেকোরা রাতে পাহাড় কাটে, সেহেতু আমি সীমিত জনবল নিয়ে রাতে অভিযানে যেতে পারি না।
পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে মোশারফ হোসেন বলেন, তারা অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় হামলার ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নিতে পারছি না। তবে কয়েকটি মাটি কাটার পয়েন্ট আমরা ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছি।
এদিকে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন রাজারকুল রেঞ্জের রাজারকুল, দারিয়ারদীঘি, আপারেজুসহ আশপাশের এলাকায় সরকারি বনায়নের গাছ নির্বিচারে ধ্বংস করে ১০০ একরের বেশি বনভূমি দখল হয়ে গেছে। দখলবাজ চক্রের হাতে বন বিভাগও অসহায় হয়ে পড়েছে। দখলবাজরা কোটি কোটি টাকা মূল্যের বনজ সম্পদ জবরদখল করেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজারকুল রেঞ্জের দারিয়ারদীঘি পাই বাগান এলাকায় বনভূমি অবৈধভাবে দখল করে বাড়ি নির্মাণ করছেন এক ব্যক্তি। কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে।
এ সময় তিনি বলেন, আমরা পাহাড় কাটা বন্ধ করার জন্য সামাজিকভাবে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই পেরে উঠছি না। পাহাড়খেকোরা অনেক বেশি প্রভাবশালী। তারা দিন-রাত সমানতালে অবাধে পাহাড় কাটছে। আমরা তাদের কাছে অসহায়।
খুরুশকুল বনাকাটা এলাকার মো. রুবেল বলেন, আমাদের এলাকায় আগে বড় বড় পাহাড় ছিল যেগুলোতে উঠলে সাগর দেখা যেত। সেসব পাহাড় এখন আর নেই। পাহাড়খেকোরা সব শেষ করে দিয়েছে। এখনও প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটছে তারা। কিন্তু তাদের বন কর্মকর্তারা কিছু বলে না।
খুরুশকুল তেতৈয়া এলাকার বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমরা ছোট থাকতে আমাদের এলাকায় বড় বড় পাহাড় দেখেছি কিন্তু এখন তা আর নেই। পাহাড়খেকোরা এসব পাহাড় দিনে-রাতে কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকার কেউ বাধা দিতে পারে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার সদরের খুরশকুলের পূর্বের হুল্লার ডেইল, পূর্ব হামজার ডেইল, আদর্শ গ্রাম, বনাকাটা, পূর্ব ইসলামবাদ, কদমতলী, ঘোনারপাড়া ও তেতৈয়া এলাকায় কয়েকটি পাহাড় ইতিমধ্যে নিশ্চিন্ন হয়ে গেছে। পূর্ব ইসলামবাদ মসজিদের সামনে, কদমতলী মুজিব বর্ষের ঘরের পেছনে, আদর্শগ্রাম বটগাছ তলা এলাকায়, ঘোনারপাড়া এলাকায়, তেতৈয়া এলাকায়, পূর্ব রুহুল্লার ডেইল এলাকায় দিনে-রাতে পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, থোয়াইঙ্গাকাটা কালুর দোকান এলাকায় বনভূমি ক্রয় করে পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করছে একটি পাহাড়খেকো চক্র। দারিয়ারদীঘি বিটের সাদির কাটা এলাকায় বিশাল পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে। আপারেজু বনবিটের একাধিক এলাকায় পাহাড় কেটে বনভূমি দখলের হিড়িক পড়লেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে বন বিভাগ।
থোয়াইঙ্গাকাটা জামে মসজিদের পূর্বপাশে ডাঙাবিটা এলাকায় দুই সপ্তাহ ধরে এস্কেভেটর দিয়ে দিনদুপুরে বিশাল পাহাড় কাটা চলছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি এইচএম এরশাদ বলেন, অবিলম্বে বনভূমি দখল, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা এবং পাহাড়খেকো সিন্ডিকেট সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি রাতের আঁধারে পাহাড় থেকে মাটি কাটা অবস্থায় একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেড় মাস পর মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে রাতের আঁধারে জব্দকৃত ডাম্পারটি ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, কক্সবাজারে বেপরোয়া গতিতে বাড়ছে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বনভূমি অবৈধ দখল, সামাজিক বনায়নের নামে টাকা আদায়, অবৈধ করাতকল স্থাপনসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রভাবশালী পাহাড়খেকোরা রীতিমতো সিন্ডিকেট গড়ে তুলে নির্বিঘ্নে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দিনকে দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে অবৈধ দখলদার এই সিন্ডিকেট। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে পাহাড় রক্ষার দাবি এলাকাবাসীর।
এফআর